বুধবার, ২০ মার্চ ২০১৯ ইং, ৬ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৪ রজব ১৪৪০ হিজরী

You Are Here: Home » ফটো গ্যালারী » উত্তেজনা নিয়েই ডাকসু নির্বাচন আজ

উত্তেজনা নিয়েই ডাকসু নির্বাচন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও শ্বাসরুদ্ধকর টান টান উত্তেজনা নিয়েই ২৮ বছর পর আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত টানা ভোট গ্রহণ চলবে। এ উপলক্ষে ক্যাম্পাসে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তুলেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। সংঘাত-সংঘর্ষ ও অভিযোগমুক্ত ভোট করতে প্রস্তুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও। কী হবে আজ ডাকসুতে সেই প্রশ্নই ঘুরেফিরে সবার মাঝে। এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আছে স্বাভাবিক। দেশের সব গণমাধ্যমের চোখও এখন ক্যাম্পাসমুখী। এ কারণে ইতিবাচক ভোটই করতে চায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে এর মধ্যে হাজী মুহম্মদ মুহসীন ও সুফিয়া কামাল হলকে ঝুঁকিপূর্ণ বলেছে সরকারবিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানের বিদায়কে ঘিরে ফজলুল হক হল নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। ডাকসু ভোট উপলক্ষে আজ ক্যাম্পাসে সব ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকবে। নির্বাচন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য বহিরাগতদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

ডাকসুতে প্যানেল দিয়ে ভোটে অংশ নিচ্ছে সরকারি দল আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাম সংগঠনগুলোর জোট প্রগতিশীল ছাত্রঐক্য, কোটা আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ, স্বতন্ত্র জোট, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগ-বিসিএল, ছাত্রমৈত্রী, ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র মুক্তিজোট, জাতীয় ছাত্রসমাজ ও বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছেন।

কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচনে স্টিলের ব্যালট বাক্স ব্যবহার করা হবে। জানা গেছে, ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচনের জন্য গত রাতেই ভোট কেন্দ্রে ব্যালট ও ব্যালট বাক্স পাঠিয়ে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে সরকারবিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো রাতে ব্যালট বাক্স পাঠানোর তীব্র বিরোধিতা করে বলেছে, এতে আগের রাতেই সিল মারার শঙ্কা রয়েছে। এ দিকে আবাসিক হলগুলোতে ভোট গ্রহণের বুথ স্থাপন করা হয়েছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ বুথের। ডাকসু নির্বাচনে মোট নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন ৪২ হাজার ৯২৩ জন। নির্বাচনে ২৫টি পদের জন্য লড়ছেন ২২৯ প্রার্থী। আর ১৮টি আবাসিক হলে মোট প্রার্থী ৫০৯। একেকটি হলে ১৩টি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অবশ্য কয়েকটি হল সংসদে ৩৫ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও অন্যরা ছাত্রলীগের। সূত্র জানায়, ভোট গ্রহণের জন্য ১৮ হলে প্রস্তুত করা হয়েছে ৫০৮টি বুথ। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে বুথ ৩৫টি, শহীদুল্লাহ হলে ২০টি, ফজলুল হক মুসলিম হলে ৩৫টি, অমর একুশে হলে ২০টি, জগন্নাথ হলে ২৫টি, কবি জসীমউদ্দীন হলে ২০টি, মাস্টারদা সূর্যসেন হলে ৩২টি, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ৩০টি, রোকেয়া হলে ৫০টি, কবি সুফিয়া কামাল হলে ৪৫টি, শামসুন্নাহার হলে ৩৫টি, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব হলে ২০টি, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ১৯টি, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ২১টি, স্যার এ এফ রহমান হলে ১৬টি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে ২৪টি, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ২০টি এবং বিজয় একাত্তর হলে ৪০টি বুথ থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, সংশ্লিষ্ট হলের ভোটাররা নিজ হলের ভোট কেন্দ্রে বৈধ পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোট প্রদান করবে। নির্বাচনী কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রার্থী, পোলিং এজেন্ট, রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক অনুমোদিত ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কেউ ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবে না। ভোট গ্রহণের পর ভোট গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হবে। নির্বাচনের আচরণবিধিমালা অনুযায়ী, ভোট কেন্দ্রে প্রবেশের পর মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিক যোগাযোগের সব মাধ্যম বন্ধ রাখতে হবে। বুথের অভ্যন্তরে কোনো ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে না। ছবিও তোলা যাবে না। ভোট উপলক্ষে ভোটার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কেউ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবে না। ভোটার স্লিপ বিতরণের ক্ষেত্রেও প্রার্থীরা কেন্দ্রের ১০০ মিটারের মধ্যে বিতরণ করতে পারবেন না। ভোট চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ব্যতীত অন্য কেউ দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতে পারবে না। কেউ আচরণবিধিমালা লংঘন করলে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা, প্রার্থিতা বাতিল বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী যে কোনো দে দি ত হবেন। ভোটার আনা-নেওয়ার জন্য কোনো যানবাহন ব্যবহার করা যাবে না। তবে শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রে আসার ক্ষেত্রে বাইসাইকেল বা রিকশা ব্যবহার করতে পারবেন। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্রার্থীদের ব্যানার আর লিফলেটে ছেয়ে গেছে পুরো ক্যাম্পাস।

নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ভোটগ্রহণের ২৪ ঘণ্টা আগে প্রচারণা শেষ হওয়ায় গতকাল কোনো প্রার্থীকে প্রচারণা চালাতে দেখা যায়নি। তবে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনে অটোকল ও খুদেবার্তা পাঠিয়ে প্রচারণা চালিয়েছে বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা। ছাত্র সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় ও বিশ^বিদ্যালয় শাখার নেতৃবৃন্দসহ সব প্রার্থীকেই ক্যাম্পাসে দেখা গেছে। নিজেদের সমর্থকসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করছিলেন তারা। মধুর ক্যান্টিনে সারা দিন ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, কোটা এবং বামপন্থি সংগঠনগুলোসহ অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মী, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও গণমাধ্যম কর্মীদের উপস্থিতিতে মুখর ছিল। সকালেই ছাত্রলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) প্রার্থী সাদ্দাম হোসেন তার নেতা-কর্মীদের নিয়ে মধুর ক্যান্টিনে আসেন। সেখানে কিছুটা সময় কাটান তিনি। তবে ক্যাম্পাসে অন্যান্য সংগঠনের তুলনায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের কম দেখা গেলেও হলগুলোতে নিজেদের নির্বাচনী প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে তারা। নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে ছাত্রলীগের ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আমাদের ইশতেহার সর্বশ্রেষ্ঠ ইশতেহার। আর মেধার মূল্যায়ন করে দেওয়া হয়েছে প্যানেল। আমরা প্রচারণায় ভালো সাড়া পেয়েছি। আশা করছি, নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্যানেল জয়ী হবে।’ অন্যদিকে মধুর ক্যান্টিন ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় ও হাকিম চত্বর এলাকায় ছাত্রদলের ঢাবি শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকীসহ সংগঠনটির প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ও জিএস প্রার্থী আনিছুর রহমান খন্দকার অনিককে অন্য প্রার্থীদের নিয়ে অবস্থান করতে দেখা গেছে। কোটা আন্দোলনের প্লাটফর্ম ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদ’-এর ভিপি প্রার্থী নূরুল হক নূরসহ অন্য প্রার্থীদের ক্যাম্পাসজুড়েই সরব দেখা গেছে। প্রচারণায় অংশ না নিলেও বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রার্থীদের মধুর ক্যান্টিন, টিএসসি এবং ক্যাম্পাসের অন্যান্য জায়গায় দেখা যায়। নির্বাচনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মাঝে উৎসবের আমেজ লক্ষ করা গেছে। তবে, সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে তাদের অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্যাম্পাসে অনেক দিন পর নির্বাচন হচ্ছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানের যে কোনো পদে নির্বাচিত হতে ইতিমধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এই স্নায়ুযুদ্ধ কোনো কারণে সহিংসতায় রূপ নিলে তার প্রভাব পড়বে বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশসহ সমগ্র দেশে। তাই নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া না হওয়ার ওপর বিশ^বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিবেশ অনেকটাই নির্ভর করছে। বিষয়টি নিয়ে সোহানুর রহমান নামে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, দেশের রাজনীতির একটা বড় অংশ এই বিশ^বিদ্যালয় থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেতা তৈরির কারখানা ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে বাড়তি একটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এটা যেন কোনোভাবেই সহিংসতায় রূপ না নেয়। এ বিষয়ে প্রশাসনের কড়া নজর দেওয়া উচিত। এদিকে ক্যাম্পাসকে অছাত্র ও বহিরাগতমুক্ত করতে পদক্ষেপ নিয়েছে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। এর আগে হলগুলো বহিরাগতমুক্ত করতে নোটিস দিয়েছিল প্রশাসন। তবে সে উদ্যোগের ফলাফল নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলেছে। গতকাল বিকালে ক্যাম্পাস বহিরাগতমুক্ত করতে প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা মাইকিং করেন। এ ছাড়াও নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করতে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে ক্যাম্পাসের সাতটি স্পটে তল্লাশি চালায় পুলিশ। স্পটগুলো হলো- শাহবাগ, নীলক্ষেত, পলাশী, জগন্নাথ হল ক্রসিং, রুমানা ভবন ক্রসিং, দোয়েল চত্বর ও শহীদুল্লাহ হল ক্রসিং। এসব স্পটে আজ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট ও অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগ পুলিশি তল্লাশির বাইরে থাকবে। তবে মেডিকেলগামী লোকজনদের বকশিবাজার, চাঁনখারপুল হয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ।

ছাত্রদলের প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান  বলেন, আজ প্রচারের সুযোগ নেই। তবে আমরা নির্বাচনের কর্ম-পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলছি কর্মীদের সঙ্গে।

স্বতন্ত্র জোটের ভিপি প্রার্থী অরণী সেমন্তী খান বলেন, ‘আমরা এখন ব্যক্তিগত কাজ করছি। তাছাড়া ক্যাম্পাসে আছি, সাক্ষাৎ করছি আমাদের কর্মীদের সঙ্গে।’ বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি ও জিএস প্রার্থী উম্মে হাবিবা বেনজির বলেন, ‘আমরা ক্যাম্পাসেই আছি। আমাদের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে মতবিনিময় করছি।’

 

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





Leave a Comment

You must be logged in to post a comment.

© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top