সোমবার, ২৭ মে ২০১৯ ইং, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২২ রমযান ১৪৪০ হিজরী

You Are Here: Home » শীর্ষ খবর » স্বাগত মাহে রমজান

স্বাগত মাহে রমজান

বছর ঘুরে ফিরে এল সিয়াম উৎসব। সাওমের বহুবচন ‘সিয়াম’। আরবিতে রোজাকে ‘সাওম’ বলা হয়ে থাকে। ত্রিশ দিন ধরে লাগাতার রোজা রাখতে হয় বলে রোজার দিনকে বহুবচনে সিয়াম বলাই যুক্তিযুক্ত। দুয়ারে কড়া নাড়ছে রোজা। সিয়াম উৎসবে শামিল হতে বাংলাদেশের কোটি মুসলমানসহ বিশ্বের অগণিত মুসলিম আজ পুরোদমে প্রস্তুত। পুণ্যের আবাহনই হলো রোজা। ক্লেদাক্ত গ্লানিময় জীবনধারা থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায় সিয়াম সাধনায় নিজেদের সঁপে দিতে আজ প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। এই প্রস্তুতি পরিশুদ্ধ পবিত্র জীবনাচারের দিকে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার। সারা বছর মানুষ নানাভাবে বিকৃত জীবনাচারে অভ্যস্ত হয়ে পাপে-তাপে দগ্ধতায় নিমজ্জিত হয়। আর মাহে রমজানের ত্রিশ দিনের রোজায় যেন উন্নত সমৃদ্ধ পবিত্র পরিশুদ্ধ জীবনের হাতছানি নিবিষ্ট মুসলমানদের জন্য। বছরের এগারটি মাসের চেয়ে এই মাস ব্যতিক্রমী। এই মাস আত্মশুদ্ধি ও আত্মত্যাগের মাস। ধৈর্য তথা সবুরের মাস। সারা দিন উপবাসব্রত পালনের মধ্য দিয়ে রোজাদারের মাঝে পরিশুদ্ধিতা, নির্মলতা ও পবিত্রতার আমেজ বইয়ে দেয়। রোজার মাধ্যমে পুণ্যসিক্ত হওয়ার এবং আল্লাহর নৈকট্যধন্য হওয়ার অবারিত সুযোগ এনে দেয় মুসলমানদের জীবনে। তাই সিয়াম উৎসবে তথা রোজার মাসব্যাপী উৎসবের দিন ফিরে আসায় রোজাদাররা ইমানি চেতনায়-অনুভবে এবং নৈতিকভাবে উজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ পায়। বছরের এই একটি মাসের প্রতীক্ষায় থাকেন ইমানদার মানুষরা। স্বাগত মাহে রমজান। আহলান সাহলান মোবারক মাহে রমজান। শত সহস্র অভিবাদন ও সালাম হে মাহে রমজান। এস এস মাহে রমজান আমাদের নির্মলতর-শুদ্ধতর করতে এবং বিশুদ্ধ জীবনের দিকে ফিরিয়ে নিতে। মাহে রমজান- তোমার পুণ্যের ডাকে পুণ্যের স্নিগ্ধতায় আমাদের অনুদার অন্তর ও কলুষময় জীবনকে নির্মল ও পরিশুদ্ধ কর। মাসজুড়ে সিয়াম উৎসবে শামিল করে আমাদের পুণ্যস্নাত কর হে মাহে রমজান। তোমাকে পাচ্ছি বলে আজ আমরা জান্নাতি আনন্দে বিভোর ও উদ্বেলিত। হে মাহে রমজান- তোমার পুণ্যভাণ্ডার থেকে আমাদের বিলিয়ে দাও অশেষ পুণ্যধারা।

একটি কথা আছে, কর্মই ধর্ম। কাজ ও কর্মকেই ইসলাম সব সময় উৎসাহিত করে। আর মাহে রমজানের পুরো মাসই যেন একজন মুসলমানের জন্য বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের মাস। অন্য এগারটি মাসের চেয়ে এই মাসে কষ্টসাধ্য রোজা পালন ছাড়াও বহু ধরনের ইবাদত-বন্দেগি করতে হয়। দিনব্যাপী রোজা পালনের জন্য গভীর রাতে আনন্দের ঘুম ভেঙে সাহরি গ্রহণের জন্য উঠতে হয়। আবার অনেক দ্বীনদার রোজাদার রোজার মাসে প্রতি রাতেই অশেষ পুণ্যময় নফল ইবাদত ও তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন। যাঁরা তাহাজ্জুদ নামাজ এই মাসে নিয়মিত আদায় করেন তাদের ঘুম ভাঙে আরো আগে মধ্যরাতে। অনেকে আবার সারা দিন রোজা রাখেন, আরা সারা রাত কাটিয়ে দেন ইবাদত-বন্দেগিতে। তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় ছাড়াও কুরআন মজিদ ও অজিফা তেলাওয়াত, দুরুদ শরিফ-তসবিহ পাঠ ইত্যাদিতে বহু রোজাদার নিমগ্ন হন নিবিষ্ট চিত্তে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায়, সন্ধ্যায় ইফতার গ্রহণ এবং আবার ঘণ্টা দেড়েক পর মসজিদে গিয়ে নামাজে তারাবিহে শামিল হয়ে দুই-আড়াই ঘণ্টা এই বিশেষ নামাজে অতিবাহিত করা ইত্যাদি মাহে রমজানের নিত্যদিনের আবশ্যকীয় ইবাদত। অথচ কী আশ্চর্য যে, একজন সুস্থ সবল যুবকের পক্ষেও অন্য কোনো মাসে এত কষ্ট স্বীকার করা এবং সারাদিন রোজা রেখে নানাবিধ ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকা যেখানে দুরূহ ব্যাপার, সেখানে ৭০/৮০ বছরের বৃদ্ধ লোকটি পর্যন্ত অনায়াসে নির্বিঘ্নে হাসিখুশিতে উৎফুল্ল মেজাজে রোজার মাসটি বহুমুখী ইবাদত-বন্দেগিতে কাটিয়ে দিতে এতটুকুন ইতস্তত-গাফিলতি বা বিরক্তবোধ করেন না। এখানেই রোজার বিশেষত্ব, ফজিলত ও মাহাত্ম্য নিহিত। রোজার মাস যে আদতেই রহমত, বরকত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস তা একটু খেয়াল করলেই ইমানদার জনতার মন-মানসে তা উপলব্ধি হবে নিঃসন্দেহে।

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) রোজার মাসকে বরণ করে নেয়ার জন্য দুই মাস আগে থেকে প্রস্তুতি গ্রহণের তাগিদ দিতেন। মহান আল্লাহপাকের দরবারে রমজান মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকার ফরিয়াদ জানাতেন এবং রজব ও শাবান এই দুই মাসকে প্রস্তুতির মাস উল্লেখ করে এ সময় আল্লাহর কাছে তিনি অনুগ্রহ-বরকত কামনা করতেন।

রোজা রাখার নিয়ম সর্বযুগে প্রচলিত ছিল। হরযত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (দ.) পর্যন্ত সব নবী-রাসুল সিয়াম তথা রোজা পালন করেছেন। তবে তাদের ধরন, পদ্ধতি ও রোজার দিনক্ষণে ভিন্নতা ছিল। আল্লামা ইমামুদ্দিন ইবনে কাসির বলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিন দিন রোজা রাখার বিধান ছিল। পরে রমজানের রোজা ফরজ হলে তা রহিত হয়ে যায়। হযরত মুসা (আ.), হযরত ঈসা (আ.), হযরত দাউদ (আ.) সহ প্রতিটি নবী-রাসুল ও তাঁদের উম্মতরা রোজা রাখতেন। তবে তাদের রোজার সঙ্গে আমাদের রোজার ধরন ও প্রক্রিয়াগত কিছুটা তফাৎ রয়েছে। এমনকি হযরত দাউদ (আ.) বছরের অর্ধেক সময় রোজা রাখতেন। তিনি একদিন রোজা রাখতেন, পরের দিন ছেড়ে দিতেন। যাতে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে না হয় এ জন্যই তিনি বিরতি দিয়ে একদিন পর পর রোজা রাখতেন। রোজা ফরজ ইবাদত। কুরআন মজিদে আল্লাহপাক বলেন, ফামান শাহিদা মিনকুমুশ শাহ্রা ফালইয়াসুম্হু- সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে, তারা যেন এ মাসে রোজা পালন করে। (সুরা বাকারা ২:১৮৫)।

মাহে রমজান পুণ্যের সওগাত নিয়ে এলেও আমাদের দেশে রোজার মাস এলে একশ্রেণির ব্যবসায়ী বেপরোয়া হয়ে ওঠে নিত্যপণ্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। রোজার মাস যেন তাদের কাছে টাকার পাহাড় গড়ার মৌসুম। দুঃখজনক যে, যারা রোজার মাসে ভোগ্যপণ্যে দাম বাড়ান তাদের অনেকেই কিন্তু আবার রোজাদার। একজন রোজাদার হয়ে ব্যবসার আড়ালে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে অন্য রোজাদারের কষ্ট বৃদ্ধি করা অবশ্যই জুলুম ও অপরাধ। এই জন্য তাদের আল্লাহর দরবারে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। মাহে রমজান যেন সত্যি সত্যি উৎসব আনন্দের মাসে পরিণত হয় এ জন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সহনশীল, ত্যাগী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। আমার আপনার লোভের কারণে নিরীহ রোজাদাররা যেন কষ্ট না পায় সেদিকে লক্ষ রাখার আহ্বান জানাই।

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top