রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯ ইং, ৩ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ জিলহজ্জ ১৪৪০ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » শেখ কামাল ও কিছু স্মৃতি

শেখ কামাল ও কিছু স্মৃতি

রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাকঃ

 

স্কুলজীবন থেকে মাঝে মাঝে আমার দিনলিপি লেখার অভ্যাস ছিল। নিয়মিত না হলেও কলেজে আসার পর অনিয়মিতভাবে আমার এ অভ্যাসটি বজায় ছিল। মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের মানুষ অনেক কিছুই তো হারিয়েছে। একেকজন একেক রকমভাবে তাদের প্রিয় জিনিসকে জীবনের তরে হারিয়ে শোকে মুহ্যমানপ্রায় হয়ে গেছে। আমি হারিয়েছি অনেক মূল্যবান ডায়েরির পাতা, কিংবা ঐতিহাসিক তথ্যসংবলিত দলিল-দস্তাবেজ। আজকের দিনে এর মূল্যমান নির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব। নিম্নের স্মৃতিগুলো কয়েক দিনের লেখা দিনলিপি থেকে সংগৃহীত। কী কারণে খুঁজে পেয়েছি তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তা জানেন। খুঁজে পাওয়া ডায়েরির জরাজীর্ণ পাতায় আমার সতীর্থ বন্ধু শেখ কামালকে নিয়ে কিছু ঘটনার বর্ণনা নিম্নরূপ-

উদারতা : সতীর্থ শেখ কামাল : ছাত্রলীগের সাংগঠনিক বিষয়ে আলোচনা, শেখ কামালের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও তার সঙ্গে ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে দুপুরের খাবার খাওয়া, ক্লাস ছুটির পর বলাকা সিনেমা হলে ম্যাটিনি শো দেখতে যাওয়া, বলাকা ভবনে বানচিং চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ও ঢাকা কলেজের সামনে চিটাগাং রেস্টুরেন্টে খাওয়া, গল্প করাসহ নানা স্মৃতি আজও মনের কোণে ভিড় জমায়। একদিন শেখ কামালের সঙ্গে কলেজের ছাত্র রাজনীতি নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়। আলোচনার একপর্যায়ে আসন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আমাকে জেনারেল সেক্রেটারি (জিএস) পদে প্রার্থী হতে বলে শেখ কামাল। আমি দ্বিমত প্রকাশ করে বলি, এ পদে অন্য কাউকে প্রার্থী করলে ভালো হয়। আমি বরং সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করি কারণ রাজনীতিতে এ বিষয়টিই জরুরি। অমনি করিৎকর্মা কামাল পাল্টা প্রস্তাব করে বলে, ‘তাহলে তুমি ছাত্রলীগের কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নাও।’ ছাত্রলীগকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে। আমি এতেও সম্মতি না জানিয়ে বলি, দায়িত্বটা তোমার হাতেই রাখ। কিন্তু সে বলল, ‘আমি শেখ মুজিবের পোলা, আমি তো রয়েছিই। তুমিই ছাত্রলীগের কলেজ শাখার দায়িত্ব গ্রহণ কর।’ তারপর আর কোনো কথা চলে না। আমি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বভার (১৯৬৮) গ্রহণ করি। ছাত্রলীগকে সংগঠিত করতে শেখ কামালসহ আমরা কয়েকজন সংগঠক দিনরাত পরিশ্রম করতে থাকি। তারই ফলে ১৯৬৬-৬৭ সালের মতো ’৬৭ সালের ২৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ বিপুল ভোটাধিক্যে বিজয় লাভ করে।
নির্ভীক, সাহসিকতা : সতীর্থ শেখ কামাল : আমাদের সময় (১৯৬৭-৬৯) ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন জালাল উদ্দিন স্যার। সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমানের শ্বশুর ও আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানের পিতা। তিনি যেমন রাগী তেমনি মানুষ হিসেবেও কঠিন স্বভাবের। একজন জ্ঞানী শিক্ষকের চাইতেও প্রশাসক হিসেবে তার খ্যাতি ছিল দেশব্যাপী। শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার প্রতি তার প্রাধান্য ছিল বেশি। যে কারণে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে ঢাকা কলেজকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। কলেজের কিংবা ছাত্রদের কোনো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন হলে ছাত্র প্রতিনিধিরা অনেক চিন্তা-ভাবনা করে তার সঙ্গে দেখা করত। ছাত্র সংসদ নির্বাচন করার প্রাক্কালে দলীয় প্রচারণা, পোস্টারিং, পরিচিতি সভা ইত্যাদি করার ব্যাপারে তার কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতেন যা সবাইকে মেনে চলতে হতো। ছাত্ররা রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ুক তা তিনি চাইতেন না। সতীর্থ বন্ধু শেখ কামালকে নিয়ে আমাদের প্রিন্সিপাল জালাল উদ্দিন স্যারের কঠোর মনোভাব ও আচরণ সম্পর্কিত একটি ঘটনা আছে। প্রাসঙ্গিকভাবে এই স্মৃতিকথা এখানে উল্লেখ করছি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে ঢাকা কলেজের মেধাবী ছাত্রদের যোগদানে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর অনুরোধে কলেজ কর্তৃক একটা মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। নির্ধারিত সময়ে কলেজ অডিটোরিয়ামে আমাদের ব্যাচের সব ছাত্র যার যার আসন গ্রহণ করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যাদের একজন কর্নেল ও অন্যজন মেজর পদমর্যাদার কলেজে আমাদের উৎসাহিত করার জন্য আসেন। আমাদের প্রিন্সিপাল জালাল স্যার মঞ্চে এসে আসন গ্রহণ করার পর ‘মতবিনিময় সভা’ শুরু হয়। প্রথমে মেজর পদবির কর্মকর্তা ডায়াসে দাঁড়িয়ে উপস্থিত ছাত্রদের স্বাগত জানান। তারপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে পেশাগত জীবন গঠনে ছাত্রদের উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে সেনাবাহিনীতে প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা উল্লেখপূর্বক নাতিদীর্ঘ এক জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেন। মেজরের প্রদত্ত বক্তব্যের ওপর কারও কোনো প্রশ্ন থাকলে তা করার জন্য আহ্বান জানানো হয়। উপস্থিত ছাত্রদের মধ্য থেকে অনেকেই প্রশ্ন করে। কর্নেল পদবির কর্মকর্তা তার যথাযথ জবাব দেন। এভাবে মতবিনিময় সভা কিছুক্ষণ চলতে থাকে। অতঃপর সতীর্থ বন্ধু শেখ কামাল প্রশ্ন করার জন্য হাত তোলে এবং তাকে প্রশ্ন করার অনুমতি দেওয়া হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যুদ্ধের ময়দানে সাহসিকতা প্রদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ যে বীরত্বসূচক পুরস্কার বা ‘Gallantry award’ দেওয়া হয়- শেখ কামালের প্রশ্ন ছিল সেগুলো উর্দুতে কেন, বাংলায় দেওয়া হয় না কেন? প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে অডিটোরিয়ামের সম্পূর্ণ পরিবেশ বদলে যায়। পুরো মিলনায়তনে একটা থমথমে ভাব নেমে আসে। কর্নেল সাহেব কামালকে বোঝানোর চেষ্টা করেন এটা প্রাসঙ্গিক নয়, প্রদত্ত বক্তব্যের ওপর প্রশ্ন করার জন্য বলেন। কিন্তু কামাল দাঁড়ানো অবস্থায় একই প্রশ্নের উত্তর বার বার জানতে চান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জালাল স্যার মঞ্চ থেকেই চিৎকার দিয়ে বলে ওঠেন, Sit down-shut up। পরবর্তীতে তিনি আরও রেগে গিয়ে কামালকে চিৎকার করে বলেন, get out from the auditorium। পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তনের ফলে মতবিনিময় সভা স্থগিত হয়ে যায়। ছাত্ররা দ্রুত অডিটোরিয়াম ত্যাগ করে। শেখ কামালের সাহসিকতা দেখে আমরা সতীর্থ বন্ধুরা সবাই অবাক হয়ে যাই। আসলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সন্তান হিসেবে জন্মগতভাবেই শেখ কামাল এই সাহসী মানসিকতা অর্জন করেছিল।

মিছিলে, স্লোগানে শেখ কামাল : একটি আবেগাপ্লুত স্মৃতি : ঊনসত্তরের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে আগরতলা মামলার কথিত আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হকের হত্যাকে কেন্দ্র করে গণআন্দোলন জনরোষের মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ১৯৬৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা নিহত হন। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় জনতার সহিংস মিছিলে গুলি করে হত্যা করা হয় প্রায় ২০ জনকে। সম্ভবত ২০ তারিখে শোককে শক্তিতে পরিণত করার প্রত্যয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ঢাকা শহরে এক বিশাল গণমিছিল বের হয়েছিল। দুই লাইন করে বিশাল সেই মিছিলটি শৃঙ্খলা ও বিশালতার বিবেচনায় সম্ভবত একটি অনন্য গণমিছিল। সেই মিছিলে আমরা পূর্বপরিকল্পনামতো ছড়িয়ে পড়েছিলাম এবং বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে দুই লাইনের মাঝখান দিয়ে কিছু সংগঠক হেঁটে হেঁটে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করছিলাম। এ রকম একটি দলে আমার পরই ছিল শেখ কামাল তার গ্রুপ নিয়ে। শেখ কামাল অত্যন্ত দরাজ গলায় মাথায় রুমাল বেঁধে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে স্লোগান দিচ্ছিল সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রজনতা তাতে ভালোভাবে প্রতিউত্তরের মাধ্যমে সাড়া দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করা গেল লোকজন আস্তে আস্তে শেখ কামালের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছাত্রজনতা এগিয়ে আমার এবং শেখ জাহিদের দিকে চলে এসেছে আবার কিছু ছাত্রজনতা পিছিয়ে গিয়ে সৈয়দ শাহেদ রেজা ও শহীদ নজরুল ইসলাম যেখানে স্লোগান দিচ্ছিল সেদিকে সরে যাচ্ছে। বিষয়টা চোখে পড়ার মতো। আমি আর শেখ জাহিদ আবুজর গিফারি কলেজের সহকর্মী শাহাবউদ্দিনকে স্লোগান ধরিয়ে দিয়ে এগিয়ে আসা একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম তার সামনে এগিয়ে আসার কারণ। লোকটি কোনোরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব না করে সরাসরি শেখ কামালের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বেশ জোরে জোরেই প্রচন্ড ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, ‘ওই বেটা নিশ্চয় পাকিস্তানিদের দালাল, বেটা সব স্লোগান দেয় কিন্তু শেখ মুজিবের মুক্তির স্লোগান দেয় না।’ আমরা সবাই হতবাক, শেখ কামালও ওইভাবে ওর দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে জোরে বলায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কোনোরকমে নিজেদের সংযত করলাম। তাকে বলা হলো, যার দিকে আঙ্গুল দেখাচ্ছেন সে শেখ মুজিবের বড় ছেলে শেখ কামাল। সেজন্যই বাবার মুক্তির স্লোগান নিজে দিতে সংকোচ বোধ করছে। লোকটি কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে শেখ কামালের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে দৌড়ে গিয়ে সোজা ওকে ঘাড়ে তুলে নিল। তারপর শুধু একটাই স্লোগান ‘তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব’, ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’, ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, মুক্তি চাই’। সেদিন মিছিলের অন্যান্য জায়গায় দুই লাইন রাখা সম্ভব হলেও এখানে আর তা রাখা সম্ভব হয়নি। শেখ কামালকে ঘিরে সবাই স্লোগান দিতে দিতে হাঁটছিল। ভিড়ের মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখছিলাম এ যেন অন্য এক শেখ কামাল, একটু আগেও যে মাথায় রুমাল বেঁধে নেচে নেচে স্লোগান দিচ্ছিল এখন শুধু বাক্যহারা হয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে নীরবে হেঁটে চলেছে।  বাংলাদেশ প্রতিদিন।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজকর্মী।

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





Leave a Comment

You must be logged in to post a comment.

© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top