শনিবার, ৬ জুন ২০২০ ইং, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৫ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » ধপ করে চারিদিকে অন্ধকার

ধপ করে চারিদিকে অন্ধকার

প্রফেসর ড. আবদুল মান্নান:

১৪ মে বৃহস্পতিবার, ‘4:55 pm!! RIP Abba!!’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও আমার মোবাইলে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের একমাত্র ছেলে আনন্দের ক্ষুদে বার্তা। বাবার মৃত্যু সংবাদটা এই ভাবেই দিল। মনে হলো ধপ করে সব বাতিগুলো নিভে গেল, চারিদিকে সব অন্ধকার। দেশে ও দেশের বাইরে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ যেখানেই থাকুন না কেন তারা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে চেনেন না তেমন কাউকে পাওয়া যাবে না। দীর্ঘদিন ভুগছিলেন বার্ধক্য জনিত রোগে। তবে বৃহস্পতিবার রাতে জানা গেল স্যার করোনা পজিটিভ ছিলেন। ভর্তি হয়েছিলেন একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ও পারিবারিক ইচ্ছায় কয়েকদিন আগে তাঁকে সিএমএইচএ ভর্তি করানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. আবদুল্লাহকে নিয়োজিত করেছিলেন তাঁর চিকিৎসার জন্য। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি শিক্ষকও ছিলেন। শুধু প্রধানমন্ত্রী কেন? জাতির প্রগতিশীল অংশের প্রতিটি মানুষের শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা করতেন তাঁর শিক্ষককে অসম্ভব রকমের। সবকিছু ছেড়ে তাঁর হাজারো গুণমুগ্ধকে ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তিনি ছিলেন বাংলার একজন বাতিঘর। সেই বাতিঘর চিরতরে নিভে গেল। ক’দিন আগে আর এক বাতিঘর প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। দেশটা এখন বামনে ভরে যাচ্ছে।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৬৯ সালে, তাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’র এক অনুষ্ঠানে। তখন আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। একই সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন রিডার হিসেবে (সহযোগী অধ্যাপক)। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর যোগ দেওয়ার পেছনে কারণ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রমোশন পাওয়া সহজে সুযোগ হচ্ছিল না কারণ কোনও পোস্ট ছিল না। তখন একটা পোস্ট সৃষ্টি করা কত দুরুহ ছিল তা আজকের প্রজন্মকে বুঝানো যাবে না। আর আপগ্রেডেশন শব্দটি ছিল অজানা। ১৯৭৩ সালে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলে তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ট হওয়ার সুযোগ হয়। তিনি এত সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও আমাদের মতো এত জুনিয়রদের কাছে টেনে নিতে পারতেন তা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যোগ দেওয়ার পর তিনি শুধু এই বিশ্ববিদ্যালয়কেই আলোকিত করেননি তিনি চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগতকেও সমৃদ্ধ করেছিলেন, আলোকিত করেছিলেন। সেই সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছাড়াও সৈয়দ আলি হাসান, আবু হেনা মোস্তাফা কামাল, এখলাসউদ্দিন আহমদে, শামসুল হক (পদার্থ বিজ্ঞান), আবদুল করিম, আলমগির মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিন, মো. ইউনুস, রশিদ চৌধুরী, মুরতাজা বশির, দেবদাস চক্রবর্তি, মোহাম্মদ আলি, আলি ইমদাদ খান প্রমূখরা। এদের অনেকেই আজ আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তাঁরা আমাদের প্রজন্মের জন্য এক একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সহ আরো বেশ ক’জন সিনিয়র শিক্ষক ক্যাম্পাস ছেড়ে সপরিবারে ভারতে চলে যান। পথে তাঁরা এক রাতের জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন গহিরা গ্রামের দানবীর নূতন চন্দ্র সিংহের বাড়িতে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক রাতের আশ্রয় দেওয়ার অজুহাতে রাউজানের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজ হাতে নূতন চন্দ্র সিংহকে গুলি করে হত্যা করে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিচার চলাকালীন সময়ে সেখানে সাক্ষ্য দিতে গিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় তিনি প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা কমিশনে একজন সদস্য হিসেবে যোগ দেন, দেশ ত্যাগী শিক্ষকদের একটি জোট গঠন করার জন্য চেষ্টা করেন।

দেশ স্বাধীন হলে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসেন। তখন হতেই তিনি হয়ে ওঠেন সকলের আনিস স্যার। কোনও অনুষ্ঠান হলে হতে পারে তা সাহিত্য বিষয়ক অথবা কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আনিস স্যার অবধারিতভাবে তাতে প্রধান অতিথি। তিনি আমাকে অসম্ভব স্নেহ করতেন। মনে করতেন কোনও একটি কাজ অন্যকে দিয়ে না হলেও আমাকে দিয়ে হতে পারে। হোক না তাঁর গুরু অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক স্যারের জন্য শুঁটকি কেনা অথবা রেলস্টেশনে গিয়ে কোনও একটা জরুরি চিঠি রেল ডাক সার্ভিসে দিয়ে আসা। একবার জানালেন তিনি জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার করবেন। আমাকে ডেকে বললেন চট্টগ্রামেতো এই রকম সেমিনার করার কোনও অডিটোরিয়াম নেই, কোথায় করা যেতে পারে? বললাম চট্টগ্রামের আমেরিকান সেন্টারে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম আছে, তিনি অনুমতি দিলে আমি কথা বলে দেখতে পারি। পরিচালকের সাথে আমার ভালো জানা শোনা আছে। তাঁর অনুমতি নিয়ে পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতেই তিনি রাজি হয়ে গেলেন। আরো কিছু জুনিয়র শিক্ষকদের নিয়ে সেই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল অত্যন্ত সুচারুভাবে। বাংলা বিভাগ আর আমাদের বিভাগ ছিল পাশাপাশি। হঠাৎ দেখি সেমিনার শেষ হওয়ার পরদিন বেলা দশটার দিকে স্যার আমাদের কক্ষে এসে হাজির। আমি কিছুটা অবাক। তিনি বললেন, ‘মান্নান সম্মেলনের আয়োজন ও সব কিছু দেখে সকলে খুশি। আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে এসেছি’। এক অজ্ঞাত কারণে তিনি আমাকে সব সময় ‘আপনি’ করে কথা বলতেন। অনেকবার বলেছি আমাকে ‘তুমি’ বলতে কারণ আমি তাঁর ‘আপনি’ সম্বোধনে অস্বস্তিবোধ করতাম। তিনি কখনও আমাকে ‘তুমি’ বলতে রাজি হননি।

১৯৮৫ সালে খবর রটলো স্যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ছোট খাট একটি আন্দোলন গড়ে তুললো এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। স্যারকে কিছুতেই ঢাকা যেতে দেবে না। পরে এই আন্দোলনে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাই না, যোগ দিল শিক্ষক আর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও। যাওয়ার দিনক্ষণ যখন ঘনিয়ে এলো তখন আন্দোলন তাঁর ক্যাম্পাসের বাসভবন পর্যন্ত পৌঁছে গেল। একদিন এক ছাত্র বোতল ভর্তি কেরোসিন নিয়ে স্যারের বাসার সামনে গিয়ে বললেন স্যার মত না পাল্টালে সে আত্মহুতি দেবে। স্যার ভীত হয়ে এসে তাকে নিভৃত করলেন।

আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে ১৯৮৫ সালের ১৭ আগস্ট তিনি রাতের ট্রেন ঢাকা মেইল যোগে ঢাকা যাবেন বলে যখন সপরিবারে চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে উপস্থিত হয়েছেন তখন স্টেশনে তাঁর ছাত্র-ছাত্রী, গুণগ্রাহী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপচে পড়েছে। আমরা কয়েকজন তাঁর মালপত্র বগিতে তুলে দিতে সাহায্য করলাম। তিনি তখন স্টেশনে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন। বললেন তিনি নিয়মিত আসবেন। কেউ কেউতো অনেকটা বিলাপ করে কাঁদছেন। এমন দৃশ্য কদাচিৎ দেখা যায়। সময় ঘনিয়ে এলো, ট্রেনের হুইসেল বাজলো। স্যার ট্রেনে উঠলেন। আমি ছিলাম সেই চলন্ত ট্রেন হতে নামা শেষ ব্যক্তি। এক সময় ট্রেনখানি রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। নিরবে আমার চোখ হতে দু’ফোটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়লো।

১৯ আগস্ট ১৯৮৫ সালে আনিস স্যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এরপর যখনই ঢাকা এসেছি তখনই স্যার ও ভাবির সাথে দেখা করেছি। ভাবির পিড়াপিড়িতে অনেক দিন খেয়ে এসেছি। তখন তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কোয়ার্টারে থাকতেন। ২০০৩ সালের ৩০ জুন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে অবসর নিয়ে প্রথমে গুলশানে পরে মহাখালিতে বসবাস শুরু করেন। অন্তত প্রতিমাসে একবার স্যারের বাসায় যাওয়া হতো। মাঝে মধ্যে তিনি কোনও একটা কিছু তথ্যের জন্য আমাকে ফোনও করতেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ক’দিন আগেও তাঁর বাসায় গিয়েছি। বেশ দুর্বল। ভাবি জানালেন কিছু খেতে পারেন না। স্যারের একটা অভ্যাস নিয়ে ভাবিতো বলতেনই, আমিও অনেক সময় বলতাম। স্যার কোনও অনুষ্ঠানে কেউ ডাকলে না করতে পারতেন না। বলতেন এতদিন না করিনি এখন কিভাবে না করি?

আনিসুজ্জামান স্যারের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী ও গুণগ্রাহীকে কাঁদিয়ে তিনি আজ না ফেরার দেশে চলে গেলেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর আর একজন বিশ্বস্ত অভিভাবককে কয়েকদিনের ব্যবধানে হারালেন। আর দেশের প্রগতিশীল মানুষ হারালো আর একজন সদা উজ্জ্বল বাতিঘরকে। স্যার আপনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। এই দেশ ও তার মানুষ আপনার কাছে অনেক কারণে ঋণী।

লেখক:সাবেক ভিসি, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক চেয়ারম্যান ইউজিসি।

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top