শনিবার, ৬ জুন ২০২০ ইং, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৫ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » ‘এমন বাহিনীর নামই বাংলাদেশ’

‘এমন বাহিনীর নামই বাংলাদেশ’

মোঃ আসাদ উল্লাহ তুষার:

দুর্দিনে সুজনের পরিচয়। যুদ্ধের ময়দান থেকে যে পলায়ন করে না সেই তো প্রকৃত বীর। বাঙালি কি ভীতুর জাতি! কখনোই না। বাঙালি বীরের জাতি। তাই বাঙালি মায়েদেরও বলা হয় বীর প্রসিবিনি মা । ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তার প্রমান আছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালী, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে তাই বীরের মতোই প্রতিরোধ করেছিল। তাই মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম প্রহরেই রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের পুলিশ সদস্যরা জীবন বাজি রেখে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। একই ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তৎকালীন ইপিআর আজকের বিজিবি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রথমেই এই দুই বাহিনীর উপর নারকীয় হামলা চালায় । রাজারবাগ এবং পিলখানায় পুলিশ বাহিনী ও ইপিআরের বাঙালি সৈনিকেরা বীরের মতো প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরেই এই দুই বাহিনীর অসংখ্য সদস্য শহীদ হন । শুরুটা সেখান থেকেই, তারপর মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর গৌরব উজ্জ্বল ভূমিকা সারা পৃথিবী অবাক বিস্ময় দেখে।

দীর্ঘ একটি রাজনৈতিক সংগ্রামের পরেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন বাঙালিকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করে, তখন বাঙালি ছাত্র-জনতা লড়াই সংগ্রাম করে তাদের মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে । সংগ্রাম টা শুরু হয় রাজনৈতিকভাবে। জেল জুলুম, নিপীড়ন নির্যাতন সহ্য করে রাজনৈতিক নেতারা এবং দেশের সাধারন জনগন এই দেশকে স্বাধীন করতে নিরলসভাবে সংগ্রাম করে যান। তারই অনিবার্য পরিণতি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে বাঙালি নামধারী কিছু পাকিস্তানের প্রেতাত্মার বিরোধিতা ছাড়া সবাই যে যার অবস্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যায় । কিন্তু এই যুদ্ধের সম্মুখ সারি থেকে নেতৃত্ব দেন, সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন আমাদের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা। সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী তার পাশাপাশি পুলিশ বাহিনী আজকের বিজিবি আনসার যারা প্রায় সবাই একশত ভাগ সরকারের বেতনভোগী কর্মকর্তা -কর্মচারী। যারা এতদিন নিষ্ঠার সাথে তাদের উপর আরোপিত দায়িত্ব পালন করেছেন।কিন্তু যখনই মাতৃভূমির উপর আঘাত এসেছে তখনই এই বীর প্রসিবিনী মায়ের সন্তানেরা বীরের মতো প্রতিরোধ করেছে অকাতরে জীবন দিয়েছে । চাকরির মায়া করে নাই, জীবনের মায়া করে নাই,পরিবারের মায়া না করে, তারাই মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে শত্রুর মোকাবেলা করেছে । শুরুটা ওখান থেকেই কিন্তু এর শেষ কোথায় ?

সৈনিক সব সময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকে এবং তা দেশের জন্য। অবশ্য সব সৈনিকের ওই যুদ্ধে যাওয়ার সৌভাগ্য হয় না। অনেকেই সুযোগ পেয়ে তা কাজেও লাগায় না। কিন্তু এখন তো আর ওই ধরনের যুদ্ধ নাই এখন নতুন ধরনের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ দেশের সাথে দেশের না এ যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী কমন শত্রুর বিরুদ্ধে। বিশ্ববাসীর লড়াই করা এই শত্রুর নাম কোভিড -১৯ বা করোনাভাইরাস । অদেখায় এই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছে গোটা বিশ্বের মানুষ। এ লড়াই নিজেকে বাঁচানোর লড়াই, প্রিয়জনকে বাঁচানোর লড়াই, দেশকে বাঁচানোর লড়াই, দেশের মানুষকে বাঁচানোর লড়াই । আর এ লড়াইয়ের ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা হচ্ছেন ডাক্তার,নার্স, হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্মী । একইভাবে এই যুদ্ধে মানুষকে দিনরাত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা, পুলিশ বাহিনীর সদস্য সহ অন্যান্য বাহিনী। আছে প্রশাসনের লোকজন।

মরণঘাতী করোনা ভাইরাসে প্রাদুর্ভাবের কারণে যখন সঙ্গত কারণেই একজন আরেকজন থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলছে । দুঃখজনক হলেও সত্য পিতা আক্রান্ত হলে ছেলে দেখছে না, প্রিয় জন আক্রান্ত হলে স্বজন দেখছে না। মৃত্যু হলে স্বজনরা কাছে আসছে না, প্রিয়জনের মৃত্যুর পর স্বজনেরা দাফন কাফন বা শেষকৃত্য করছেনা, আসছে না গ্রাম বা মোহল্লাবাসী,সেখানে এগিয়ে এসেছে পুলিশ বাহিনী সদস্যরা।সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে, মানুষকে সচেতন রাখতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা। জানাজা পড়াচ্ছে প্রশাসনের লোকেরা, দাহ করছে প্রশাসনের লোকেরা সাথে যোগ দিচ্ছেন আমাদের এই গৌরবজনক বাহিনীর সদস্যরা। অ্যাম্বুলেন্স এ লাশ নিয়ে চলছে এই পুলিশ বাহিনীর ভাইয়েরা। যাদের আমরা এতদিন কারনে অকারনে দোষারোপ করে এসেছি। ইতিমধ্যেই প্রায় দুই হাজারের বেশি পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। অর্ধডজন পুলিশ সদস্য ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন । পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন আছেন হাজার হাজার পুলিশ সহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্য । তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তাদের অবদানও এই যুদ্ধে কম না।

মরণঘাতী এই করোনা ভাইরাস প্রকোপের কারণে বিশ্ব তথা আমাদের দেশ সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। সব সেক্টরে কাজকর্ম বন্ধ করে ঘরে বসে লকডাউন অবস্থায় আছে মানুষ। কর্মহীন হয়ে পড়েছে কোটি কোটি মানুষ। নিম্নআয়ের মানুষের বেহাল অবস্থা, তাদের ঘরে খাবার নেই, কাজ নেই, মানবেতর জীবনযাপন করছে কর্মহীন হয়ে পড়া এই গরীব মানুষেরা, দিনমজুরেরা, শ্রমিকরা, নিম্ন আয়ের মানুষেরা। তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন সরকারসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ । এই অসহায় মানুষদের নিজের কাঁধে করে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে এই পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। এই দুঃসময়ে তারা প্রমাণ করেছেন আবারো ‘মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য’। অনেক উন্নত দেশেই দুঃখজনক হলেও সত্য দেখা গেছে দায়িত্ব পালনের ভয়ে বা অতঙ্কিত হয়ে বিল্ডিং এর ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে ডাক্তার না স্বাস্থ্য কর্মী বা অন্য কোন বাহিনীর লোকদের আত্মহত্যার খবর। কিন্তু আমাদের দেশে এমন খবর নাই। ডাক্তার আক্রান্ত হচ্ছে, সুস্থ হয়ে আবার কোন করোনা রোগের চিকিৎসা করছে। পুলিশ বাহিনীর, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আক্রান্ত হচ্ছে আবার সুস্থ হয়েই দায়িত্ব পালন করছে। কেউ যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করে নাই।

অদেখা এই শত্রুর বিরুদ্ধে তাঁরা নিজের জীবন বাজি রেখে পরিবারের কথা চিন্তা না করে, বীরের মতো লড়াই করে যাচ্ছে। তাদের ছোটখাটো ভুলের জন্য আমরা প্রতিনিয়ত দোষ দিয়ে থাকি, তাদেরকে দোষ ধরা আমাদের ফ্যাশনে পরিণত হয় মাঝে মাঝে । কিন্তু দুর্যোগ-দুর্বিপাকে, দেশের কল্যাণে সুযোগ থাকলে তারা সবটুকু ঢেলে দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে, তার প্রমাণ তারা এবার রেখেছে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে বা দিচ্ছে, বাঙালি বীরের জাতি, বাঙালি যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করে না। তারা বীরের মতই লড়ে অতীতের মতই বিজয়ের বেশে ঘরে ফিরবে ইনশাল্লাহ। স্যালুট পুলিশ বাহিনীকে, স্যালুট সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরকে। আপনাদের এই ত্যাগ আগামী প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে, নিশ্চিত সাহস যোগাবে। আপনারা আমাদের গর্ব।

লেখক:সম্পাদক,সংসদগ্যালারীটুয়েন্টিফোরডটকম

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top