বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০ ইং, ৩১ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৫ জিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » ‘করোনা জয়ের অভিজ্ঞতা’

‘করোনা জয়ের অভিজ্ঞতা’

মেহেদী মাসুদ:

 

সাংবাদিক, লেখক মেহেদী মাসুদ করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ্য হয়েছেন।তিনি এখন করোনা পজেটিভ থেকে করোনা নেগেটিভ। তার সেই করোনা জয়ের গল্পই লিখেছেন তাঁর নিজের ফেসবুক ওয়ালে নিচে তা তুলে ধরা হলো

বাসায় ‘কোভিড নাইন্টিন চিকিৎসা’য় আছে শান্তি, আছে ভয়, আছে আশঙ্কা

বাসায় নতুন অতিথি এসেছে। একদম অপিরিচিত। অর্থ, ক্ষমতা আর প্রভাবের দিক থেকে আপনার চেয়ে অনেক গুণ এগিয়ে। আপনার বাড়ি আর জায়গা দখল করে নিতে চায়। আপনাকে উচ্ছেদ করতে চায়। মুহূর্তেই পুরো পরিবারসহ আপনাকে শেষ করে দিতে চায়। সবার জীবন শতভাগ হুমকির মুখে। মামলা? সে তো লম্বা প্রক্রিয়া! আপনাকে এখনই এই অতিথির মুখোমুখি হতে হবে।

আমার কাছে কোভিড নাইন্টিনকে ঠিক এমনই মনে হয়েছে। তাই এই অপরিচিত ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর মনের দিক থেকে শক্ত থাকার চেষ্টা করেছি। মৃত্যুর ভয়কে এক মুহূর্তের জন্যও মনের মধ্যে জায়গা করে নিতে দেইনি।

বন্ধুরা আপনারা জানেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধের জন্য সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার পর ১ এপ্রিল থেকে মাদল পথের ধারের অভুক্ত মানুষদের রান্না করা খাবার দিচ্ছে। শুরুতে ২০০-২৫০ হলেও ঈদের আগে ১৫০০ জনকে পর্যন্ত আমরা খাবার দিয়েছি। এই কাজ এখনো অব্যাহত আছে। তাই মনের মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার ভয় তো সব সময়ই ছিল। শেষ পর্যন্ত ভয়টাই সত্যি হলো।

৮ মে ইফতারের পর হঠাৎ শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, ১০২। সঙ্গে বাড়তে থাকে গায়ের ব্যথা, গলা ব্যথা, কাশি আর ডায়রিয়া। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে গায়ের ব্যথা সহ্য সীমার বাইরে চলে যায়। বাথরুমে যাওয়া–আসা বেড়ে যায়। জ্বর শুরু হওয়ার পর থেকেই কথা হচ্ছে ভাই–বন্ধু শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শাকিল আহমেদের সঙ্গে। তিনি আমাকে কোভিড নাইন্টিন পজেটিভ হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেন। তখনই সবার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

আমি আলাদা রুমে চলে যাই। যাকে বলে ‘নিভৃতবাস’ (আইসোলেশন)।

ডা. মিলুর সহায়তায় ৯ মে স্কয়া্র হাসপাতালে ডা. প্রতীক দেওয়ানের সঙ্গে দেখা করি। তিনি কোভিড নাইন্টিন পরীক্ষার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ তখনই শুরু করতে বলেন। ১২ মে বিকেল ৪টা ৩২ মিনিটে হাসপাতাল থেকে টেলিফোনে জানানো হয়, আমার কোভিড নাইন্টিন পজেটিভ।

মুহূর্তেই নানা ভীতিকর পরিস্থিতির সম্ভাবনা মনের মাঝে এসে ভিড় করে। কী করব? কোথায় যাব? কার কাছ থেকে সহযোগিতা পাব? আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে আম্মা, বউ আর বাচ্চাদের কী হবে?—এমনি নানা প্রশ্ন আমাকে ঘিরে ধরে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ি।

স্বাস্থ্য বাতায়নে ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করি। ওপারে মেয়ের কণ্ঠ। পরিচয় দিলেন, তিনি ডাক্তার। তিনি আমার সব অসুবিধা শুনলেন। কী কী ওষুধ খাচ্ছি, তাও জানলেন। অনেকক্ষণ কথা বলার পর তিনি আমাকে বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। শুধু শ্বাস কষ্ট শুরু হওয়া মাত্রই দ্রুত যে কোনো কোভিড হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বলেন। বাসায় অক্সিজেনের ব্যবস্থা রাখতে বলেন। বাসায় অক্সিমিটার কিনতে বলেন। বুকের একটা এক্স–রে করার জন্য বলেন। তিনি ভবিষ্যতে মাদলে আসার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন, নিজের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর দেন, কোভিড সংক্রান্ত যে কোনো প্রয়োজনে কল দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।

খবর পেয়ে বোনের জামাই অধ্যাপক ডা. ফরহাদ মঞ্জুর ফোনে কথা বলেন। তিনিও আমাকে বাসায় থাকার পরামর্শ দেন। এর পর প্রতি দিন তিনি ২–৩ বার ফোনে কথা বলেছেন, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রতিদিন একাধিকবার ফোন করে খবর নিয়েছেন, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন স্কুলের বন্ধু অর্থোপেডিক সার্জন অধ্যাপক ডা. রফিক আহমেদ।

আরেকজনের কথা না বললেই নয়, তিনি ডা. আফরোজা সুলতানা, ভাগ্নের বউ। তিনি কোভিড নাইন্টিন হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। গাজীপুর থেকে প্রতিদিন কয়েকবার আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রায়ই খাবারের ছবি তুলে তাঁকে পাঠাতে হতো। তিনি চিংড়ি মাছ আর গরুর মাংস খেতে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন।

১২ মে বিকেলে ফেসবুকে আমার পেজে একটা পোস্ট দিই, ‘বন্ধুরা, আমার কোভিড নাইন্টিন পজেটিভ।’ এই পোস্ট দেওয়ার পর আমি যেমন অসংখ্য বন্ধুর ভালোবাসা পেয়েছি, দোয়া পেয়েছি, শুভকামরা পেয়েছি; তেমনি নানা বিড়ম্বনার মুখোমুখি হয়েছি। আত্মীয়স্বজনেরা উৎকণ্ঠিত হয়েছেন। অনেকেই ধরে নিয়েছেন, আমি মারা যাচ্ছি। কেউ কেউ ক্ষমা চেয়েছেন, তারা আমার কাছ থেকেও তা–ই আশা করেছেন। রাতে গ্রাম থেকে একজন আত্মীয় ফোন করে চিৎকার করে কাঁদছিলেন, তাঁর পাশে তখন আমার আরও কয়েকজন আত্মীয়ের বিলাপ শুনতে পাই। ওই সময় এই সবই আমাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়।

আমি কোভিড নাইন্টিন ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকেই আমার এবং আমার বউয়ের ফোনে কল দিয়েছেন। খোঁজ নিয়েছেন, সান্ত্বনা দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন, যে কোনো প্রয়োজনে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।

তবে জনপ্রিয় সাহিত্যিক ও সাংবাদিক পরম আত্মীয় আনিসুল হক ভাই আর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদের খতিব ভাই ও বন্ধু সাইফুল ইসলাম নিয়মিত ফোন করেছেন, কথা বলেছেন। প্রতিদিন ফোন করেছেন সৈয়দ আপন আহসান। যুক্তরাষ্ট্র থেকে খবর নিয়েছেন বন্ধু অনিন্দিতা কাজী আর তাঁর বর শাহীন তরফদার। দুই বোন ফারহানা রিজওয়ান আর তাসবিরা রিজওয়ান ও তাঁর স্বামী বাঁধনের উৎকণ্ঠা দেখেছি। ছোট ভাই ফটোনিক প্রকৌশলী জাহেদী আব্বাস নেদারল্যান্ডস থেকে প্রতিদিন ফোন করেছে, সেখানে থেকে এ দেশে ওষুধের ব্যবস্থা করেছে। শ্বশুর–শাশুড়ি আর শ্যালিকা তনু ও তাঁর স্বামী ফাহাদকে দেখেছি আমার বউয়ের কাছে নিয়মিত ফোন করতে।

সবচেয়ে বড় কথা আমার বউডার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। শুরু থেকেই মনের জোর বাড়ানোর কথা বলেছে। আমার জন্য পুরো সময়টাতে, এমনকি এখনো যা করছে, তা বলে শেষ করা যাবে না। সব ঝুঁকি এড়িয়ে ও বারবার ছুটে এসেছে। দরজার বাইরে কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থেকেছে, আমার দিকে তাকিয়ে থেকেছে। সকালে মেথি ভিজিয়ে, কালোজিরা আর কুসুম গরম পানিতে মধু মিশিয়ে দিয়ে গেছে।

রাতে দুই ছেলে পূর্ণ আর গল্প আমার সঙ্গে কথা বলার সঙ্গে অপেক্ষা করে থাকত। বউ ভিডিও কলে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিত। এভাবে কথা হতো আম্মার সঙ্গেও।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাইদুর রহমান ভাই ১২ মে ইফতারের আগে ফোনে কথা বলেন। ইফতারের পর তিনি অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবিরের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করিয়ে দেন। তিনি আমার সব কথা মন দিয়ে শোনেন। তিনিও বাসায় থাকার পরামর্শ দেন।

কয়েকটি সরকারি হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের ব্যপারে আমার যথেষ্ট ধারণা হয়, বুঝতে পারি, সেখানে থাকলে আমি আরও অসুস্থ হয়ে যাব। তাই বাসায়ই আমার শোবার ঘরকে নিভৃতবাসের জন্য বেছে নিই, এখানেই শুরু হয় আমার চিকিৎসা।

শুরুতেই দুজন মানুষ আমার মনোবল দৃঢ় হতে দারুণ ভূমিকা রাখেন। আমার সাবেক সহকর্মী প্রথম আলোর বিশেষ বার্তা সম্পাদক শওকত হোসেন মাসুম মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসার পর ২ মে বাসায় ফিরেছেন। একটা খুদে বার্তা পাঠানোর পর মুহূর্তেই তিনি আমাকে ফোনকল দেন এবং প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরামর্শ দেন। তাঁর পরামর্শগুলো দারুণ কাজে লেগেছে, আমি এখনো তা মেনে চলছি।

এই যেমন—
* দিনে অন্তত চারবার গরম পানির ভাপ নিতে হবে।
* সারা দিনে অন্তত চারবার গার্গেল করতে হবে।
* দারুচিনি, আদা আর লবঙ্গ দিয়ে পানি ফুটিয়ে তা কিছুক্ষণ পরপর পান করতে হবে।
* ঠান্ডা বা ফ্রিজের কোনো কিছু খাওয়া যাবে না।
* ইউটিউবে শ্বাসের অনেক ব্যয়াম আছে। সেটা দিনে কয়েকবার করতে হবে।
* প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার বেশি বেশি খেতে হবে। মাছ, মুরগি, ডিম, সবজি।
* লেবু খেতে হবে। বিভিন্ন ফলের জ্যুস খেতে পারলে খুবই ভালো।
* অরুচি হবে, খাবারের কোনো স্বাদ পাবেন না, তার পরও জোর করে খাবেন।
* প্রচুর পানি খাবেন। যাতে শরীরে পানির কোনো ঘাটতি না হয়।
* অক্সিমিটার ও থার্মোমিটার কিনে নিন। অন্তত দুই ঘণ্টা পর পর অক্সিজেন, পালস আর শরীরের তাপমাত্রা নিজেই দেখবেন এবং তা ডায়েরিতে লিখে রাখবেন।
* রুম থেকে একদম বের হওয়া যাবে না।
* নিজের ব্যবহৃত সব কাপড়, বিছানার চাদর, বালিশের কভার নিজেকেই ধুতে হবে।
* ঝাড়ু দিতে হবে।
* খাবার খাওয়ার পর ব্যবহৃত প্লেট, গ্লাস, বাটি সব নিজেকেই ধুতে হবে।
* রুমের ভেতর মাস্ক ব্যবহার না করলেও চলবে। কিন্তু কেউ দরজার সামনে এলে অবশ্যই মাস্ক পড়তে হবে।
* বউ বা ছেলেরা ভুলেও রুমে ঢুকতে পারবে না।
* পরিচিত ডাক্তারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করবেন। স্বাস্থ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি তাদের জানাবেন।
* রুমে ছোট ছোট ব্যায়াম করবেন।
এ ছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসা আর ওষুধ সংক্রান্ত কিছু পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তবে তিনি খুব প্রয়োজন না হলে হাসপাতালে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। বাসায় থাকলে কী কী সমস্যা হতে পারে, সে ব্যাপারেও কিছু ধারণা দিলেন।

আরেকজন এটিএন বাংলার সিনিয়র নিউজ এডিটর মানস ঘোষ। তিনি আমার মেসেঞ্জারে লিখলেন, ‘মাসুদ ভাই, আমার ফোন নাম্বারটা নিশ্চয়ই আছে। যে কোনো প্রয়োজনে সাথে সাথে যোগাযোগ করবেন। আমরা সব ধরনের যোগাযোগে আছি। বাসায় থেকে ভালো হয়ে উঠুন, এই প্রার্থনা করি। তারপরও অ্যাম্বুলেন্স আর হাসপাতালের সাপোর্ট লাগলে আমরা দেখব।’

ওই সময় এই কথাগুলো আমার মনে দারুণ প্রভাব ফেলেছে। একটা ইতিবাচক আশ্বাস মনোবলকে চাঙা হতে দারুণ সহযোগিতা করেছে। মনে হয়েছে, আমি হয়তো এই যাত্রায় বেঁচে যেতে পারি। কারণ হাসপাতাল বা আইসিইউতে ভর্তি হওয়া নিয়ে আমার মনে যে দুশ্চিন্তা ছিল, তা দূর হয়ে যায়। যদিও শেষ পর্যন্ত আমাকে আইসিইউতে যেতে হয়নি।

আমার শোবারঘরে নিভৃতবাসে শুরু হয় নতুন যুদ্ধ।

বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার যে যে সুবিধা আমি ভোগ করেছি, তা হলো—
* আমি পরিবারের সবার মাঝেই আছি।
* তাই কোভিড নাইন্টিন ভাইরাসের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হলেও তা আমাকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে পারেনি।
* সময় ধরে ধরে বউডা খাবার, ফল আর গরম পানি দরজার সামনে রেখে দিয়ে গেছে। ও চলে যাওয়ার পর আমি দরজা খুলে তা রুমের ভেতরে নিয়ে আসি।
* প্রতিদিন ভোরে সূর্য ওঠা দেখেছি।
* রুমের ভেতরে হাটাহাটি করেছি। ব্যায়াম করেছি।
* রক্ত, ইউরিনসহ যে কোনো পরীক্ষার জন্য দ্রুত পাশের স্কয়ার হাসপাতালে চলে গেছি। নির্ধারিত সময়ে রিপোর্ট পেয়ে গেছি। ডাক্তারদের কাছে তা পাঠিয়েও দিয়েছি।
* ঝড় হয়েছে, বৃষ্টি হয়েছে; তা দরজা খুলে জানালা খুলে দেখেছি।
* রুমের সামনে উঠানে কিছু গাছ আছে, সেসব টবে পানি দিয়েছি।
* একবারও মনে হয়নি আমার চিকিৎসা হচ্ছে। (অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়া ছাড়া)
* আল্লাহর কাছে বারবার শুকরিয়া জানিয়েছি, তওবা করেছি।
* নামাজ আদায় করেছি, বই পড়েছি, গান শুনেছি, পরিচিত স্কলারদের ইসলামিক আলোচনা শুনেছি, সিনেমা দেখেছি।

এগুলো হলো শান্তির কথা। পাশাপাশি ছিল ভয় আর আশঙ্কা। এই যেমন—
* একটা ফরেন বডি শরীরে ঢুকে পড়েছে। সে যুদ্ধ করছে বিভিন্ন অ্যান্টি বডির সঙ্গে। ফলে শরীরের ভেতর তখন তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। মনে হয় যেন শরীরের ভেতর কেউ তুর্কি নাচ নাচছে।
* শুরু থেকেই দুর্বলতা গ্রাস করে। বিছানায় ডান দিক থেকে বাম দিকে ফিরলে মনে হয়েছে যেন বাম দিক থেকে বিল্ডিংটা পড়ে যাচ্ছে।
* হঠাৎ উপরের দিকে তাকালে মনে হয়েছে, ছাদটা ঘুরছে। হাসপাতালে থাকলে হয়তো এ সময় ডাক্তার বা নার্সদের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যেত।
* এই দুর্বলতা এখনো আছে।
* শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা যখন ৯০ বা তার নিচে চলে আসে, তখন ‘এখনই কোথায় অক্সিজেন পাব’, এই দুশ্চিন্তায় আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছি। শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য ডাক্তার যে ওষুধ দিয়েছেন, তা খাওয়া আর সহকর্মী বলেছেন শ্বাসের ব্যায়াম করতে, এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। এর ফলে যে কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটতেই পারত।
* পর পর দুই রাতে যখন অক্সিজেন নিতে পারছিলাম না, পিঠের পেছনে বালিশ উচু করে দিয়ে বসে ছিলাম, লম্বা লম্বা শ্বাস নিচ্ছিলাম, তখন পাশে কেউ ছিল না। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিল। ডাক্তারকে ফোন করেছি। তিনি বললেন, তখনই হাসপাতালে চলে যেতে।
* ডায়রিয়া যখন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না, তখন স্যালাইন দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু কে স্যালাইন দেবে। বাসায় তো তেমন কেউ নেই। আর বাইরে থেকেও কাউকে আনা যায়নি। আবার মুখেও খেতে পারিনি। আমার উচ্চ রক্তচাপ সমস্যা আছে। তার জন্য নিয়মিত দুই বেলা ওষুধ খেতে হয়।
* অ্যালার্জির কারণে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফুলে যায়। সেগুলো চুলকাচ্ছে, ব্যথা হচ্ছে। সব কিছু অসহ্য হয়ে যাচ্ছে। জানতে পেরে বন্ধু ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামিম ফোনে ওষুধ দিয়েছেন।
* ২১ মে সন্ধ্যায় ইফতারের পর হঠাৎ বুঝতে পারি, আমার গলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আলজিহ্বা যথেষ্ট ফুলে গেছে, শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে, জোরে কাউকে ডাকতে পারছি না। তখন বউডা খাওয়ার জন্য গরম পানি নিয়ে আসে। আমার অবস্থা দেখে ও চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। বড় ছেলে পুর্ণও কাঁদছে। কী করতে হবে, আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে, এসব নিয়ে তারা চিন্তিত। আমারও মনে হচ্ছে, হয়তো দ্রুত সব কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনই ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বন্ধু ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তিনি তখনই দুটি জি ম্যাক্স ৫০০ খাওয়ার জন্য বলেন। মিনিট দশেক পর আমি স্বাভাবিক হতে শুরু করি। হাসপাতালে থাকলে হয়তো আমাকে কিংবা আমার পরিবারকে ততটা আতঙ্কিত হতে হতো না।
* ঘুমের পরিমাণ একেবারেই কমে যায়। প্রায় সবকটি রাত না ঘুমিয়েই কেটেছে। এমনকি দিনেও তেমন ঘুমাতে পারিনি।

বুঝতেই পারছেন, নানা শান্তি পেলেও বাসায় কোভিড নাইন্টিন চিকিৎসায় রয়েছে শতভাগ ঝুঁকি। আর তা হলো মৃত্যুর ঝুঁকি। যদি সেই পরিস্থিতির তৈরি না হয়, নিউমোনিয়া না হয়, স্যালাইন, ইনজেকশন আর অক্সিজেন দিতে না হয়, তা হলে হাসপাতালের নানা ঝক্কি–ঝামেলা এড়িয়ে আপনি বাসায় থাকতেই পারেন। তবে যে কোনো ওষুধ খাওয়ার জন্য ডাক্তারের কাছ থেকে পরামর্শ নেবেন। কেউ বললো, তা শুনে আপনি মোটেই খাবেন না। কারণ একজনের সমস্যার সঙ্গে কিন্তু আরেকজনের সমস্যার কোনো মিল নেই। ভাইরাসটি একেকজনের শরীরে একেক ভাবে ব্যবহার করে।

নিভৃতবাসের সময়টাতে কোভিড ভাইরাসে আক্রান্ত ইন্ডিপেন্ডেন্ট টুয়েন্টিফোর টিভির সিনিয়র নিউজ এডিটর গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে প্রায়ই কথা হয়েছে। আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছি। শেষে তিনি আমাকে নয়াবাজারে মহানগর হাসপাতালে কোভিড ভাইরাসের পরপর দুটি টেস্ট করার ব্যবস্থা করিয়ে দেন।

বন্ধুরা, এখন পরপর দুবার আমার কোভিড নাইন্টিন নেগেটিভ হয়েছে। কিন্তু আমি এখনো নিভৃতবাসে আছি। বোনের শ্বশুর ডা. মাহফুজুর রহমান আঙ্কেল গত বৃহস্পতিবার রাতে ফোন করে বললেন, ‘তুমি কিন্তু এখনো স্বাভাবিক জীবনে যাওয়ার ছাড়পত্র পাওনি। শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার জন্য তোমাকে আরও ১২–১৪ দিন পুরোপুরি নিভৃতবাসে থাকতে হবে।’

পরপর দুবার নেগেটিভ হওয়ার খবরে যতটা খুশি হয়েছিলাম, মুহূর্তেই মনের মধ্যে আবারও কালো মেঘ ঘিরে ধরে। আমি এখন নিভৃতবাসেই আছি। সবার খুব কাছে, কিন্তু অনেক দূরে। সারা রাত একটি গান শুনেছি, গেয়েছি; কখন যে দু চোখ বেয়ে পানির বন্যা বয়ে গেছে, টের পাইনি। সৃষ্টিকর্তার কাছে দুই হাত তুলে গেয়েছি—
প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে
মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ।
তব ভুবনে তব ভবনে
মোরে আরো আরো আরো দাও স্থান।।
আরো আলো আরো আলো
এই নয়নে, প্রভু, ঢালো।
সুরে সুরে বাঁশি পুরে
তুমি আরো আরো আরো দাও তান।।
আরো বেদনা আরো বেদনা,
প্রভু, দাও মোরে আরো চেতনা।
দ্বার ছুটায়ে বাধা টুটায়ে
মোরে করো ত্রাণ মোরে করো ত্রাণ।
আরো প্রেমে আরো প্রেমে
মোর আমি ডুবে যাক নেমে।
সুধাধারে আপনারে
তুমি আরো আরো আরো করো দান।।

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top