বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০ ইং, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৩ জিলহজ্জ ১৪৪১ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » ‘অপূরণীয় ক্ষতি’

‘অপূরণীয় ক্ষতি’

মোঃ আসাদ উল্লাহ তুষার:

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে বিশ্বজুড়ে প্রায় পৌনে দুই কোটির  উপর মানুষ আক্রান্ত হয়েছে । প্রায় পৌনে সাত লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল দিন দিন বেড়েই চলছে। এই মরণঘাতী ভাইরাসের কারণে বিশ্ব পর্যদুস্থ। বাংলাদেশেও এ পর্যন্ত তিন হাজারে’র বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। আক্রান্তও সোয়া দুই লাখের বেশি। বিশ্বমোড়ল থেকে শুরু করে একেবারে গরীব রাস্ট্রটিও অসহায়। বিশেষ করে সর্বউন্নত দেশগুলো যেখানে একটি জীবন বাঁচাতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সেখানে তারা শুধু লাশের হিসাব রেখে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা হয়তো এখনও চিন্তাই করছে না। সে ক্ষতি না হয় আবার যুদ্ধ বিগ্রহ বাঁধিয়ে পুষিয়ে নেয়া যাবে। কিন্তু হাজার হাজার বা কোন দেশে লক্ষ লোকের প্রাণহানিতে যে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হলো তা পুষিয়ে নিবে কিভাবে?

মানুষের মৃত্যুর চেয়ে অপূরণীয় ক্ষতি আর কিছুই নাই। সম্পদ গেলে সম্পদ পাওয়া যায়, কিন্তু জান গেলে জান পাওয়া যায় না । এই ক্ষতি অপূরণীয় । মানুষ মরণশীল, প্রত্যেক মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু হঠাৎ করেই যেখানে কোনো মহামারী বা প্রাণঘাতী ভাইরাসের কারণে পর্যাপ্ত চিকিৎসা বা সেবা-শুশ্রূষার অভাবে অনেককে দুর্বিষহ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে। মৃত্যুর পরেও এই সমস্ত মানুষ গুলিকে দাফন কর্মে বা শেষকৃত্যে অনেক অবহেলার শিকার হতে হচ্ছে। তাই করোনা ভাইরাসের কারণে আমাদের মনোজগতে বিরাট আঘাত সৃষ্টি করেছে। সারা পৃথিবীব্যাপী জীবন যাপনে একধরনের বিরাট পরিবর্তন এসেছে, মানুষ ঘর বন্দী হয়ে বসে আছে, সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ,স্থবির হয়ে আছে পৃথিবী । মুখে মাস্ক লাগিয়ে, হাতে হ্যান্ড গ্লাভস বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে যতটুক সম্ভব মানুষ দিন যাপন করে যাচ্ছে।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এর সময়ে পৃথিবীব্যাপী অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ অবস্থায় আছে। ঘরবন্দি মানুষ, কাজকর্ম সব বন্ধ। বাংলাদেশের অবস্থাও এর থেকে বাইরে নয় । এই ভাইরাসের কারণে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরাট আঘাত এসেছে। খেটে খাওয়া দিনমজুর, গরীব মানুষেরা অনেক কষ্টে জীবন যাপন করছে । নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষেরা অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের এর মধ্যে পড়েছে । ইতিমধ্যেই বিরাট সংখ্যক মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে স্থবিরতা বিরাজ করছে, তিন মাসের বেশি সময় ক্লাস বন্ধ। কবে স্কুল কলেজ খুলবে তার কোন সঠিক দিনক্ষন ঠিক হয়নি এখনো। কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের মনোজগতে এক বিরাট আঘাত এনেছে । এই ক্ষতিও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিরাট আঘাত। সমাজ জীবনে আমরা আগে যেভাবে চলে এসেছি আগামীতে হয়তো সেভাবে চলা সম্ভব হবে না। আমাদের জীবনযাত্রার ধরন নিশ্চিতভাবেই পাল্টে যাবে। মানুষে মানুষে এই যে সামাজিক দূরত্ব সেটা নিঃসন্দেহে মানুষের চলার পথে বিরাট ক্ষতের সৃষ্টি করবে। বাস্তবতার কারণেই হয়তোবা আমাদের মানিয়ে নিতে হবে।

পৃথিবী যখন দিনদিন উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে সারা পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। মানুষ যখন উন্নত জীবন যাপনের জন্য নানান ধরনের পন্থা অবলম্বন করছে, টেকনোলজি যখন মানুষের চিন্তার সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলছে, তখন এক অদেখা শত্রু এই করোনা ভাইরাস আমাদের কত অসহায় করে ফেলেছে । এই মুহূর্তে প্রযুক্তি কোন কাজে আসছে না, বিজ্ঞান কোন ফল দিচ্ছে না। ভাইরাসের কাছে মানুষের বুদ্ধি আজ পরাজিত, অস্ত্র অর্থের ঝনঝনানি আজ নিষ্পেষিত এই ঘাতক করোনা ভাইরাস এর কাছে । ক্ষমতাধর শক্তিশালী দেশ আজ পর্যদুস্ত, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের আজকে দিশাহারা, বিশ্বের তাবৎ ধনকুবের আজকে ঘরবন্দি এই ভাইরাসের ভয়ে। কোন কিছুতেই মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। কোন কোন দেশে হাজার হাজার থেকে লাখে পৌঁছে গেছে মৃত্যু। রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে বাঁচিয়ে ডাক্তারের মৃত্যু হচ্ছে, হচ্ছে অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু। মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে বা সেবা দিতে গিয়ে পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা মৃত্যু বরণ করছেন। মৃত্যু বরণ করছেন সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তা সহ স্বেচ্ছাসেবীরা। যারা নিজের জীবন দিয়ে অন্যের জীবনকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। আমাদের দেশের প্রায় ষাট জনের উপর ডাক্তার,বেশ কিছু স্বাস্থ্যকর্মী, বেশ কিছু পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, সিভিল প্রশাসনের সদস্যরা সেবা দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। ইতিমধ্যেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মন্ত্রী, সচিব,সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য,সাবেক সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ,শিক্ষাবিদ, শিল্পপতিসহ মারা গেছেন বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক । এসব মৃত্যু স্ব স্ব পরিবার ও দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর অর্থবিত্তে শৌর্যবীর্য এ পরাক্রমশালী আমেরিকায় দের লাখেরও বেশি মানুষ করোনা ভাইরাসে মৃত্যুবরণ করেছে। আক্রান্তও চল্লিশ লাখের উপরে। করোনা ভাইরাস আমেরিকার বিশ্ব মোড়ল গিরি থামিয়ে দিয়েছে। তাদের অর্থ, ক্ষমতা,টেকনোলজি আজকে এই অদেখা ভাইরাসের কাছে পরাজিত। কোন মারণাস্ত্রেই কাজে লাগছে না, কাজে লাগছে না সর্বশেষ আধুনিক প্রযুক্তিও, সবই অসহায় এই ভাইরাসের কাছে। এই ভাইরাস মোকাবেলা করতে বিশ্বের অন্য দেশের মতো ওষুধ তৈরীর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে আমেরিকা। বাংলাদেশও ঔষধ তৈরির প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এই ভাইরাসে অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে হয়তো একদিন তা পুষিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু যে প্রাণহানি হয়েছে তা কোনদিনও ফিরিয়ে আনতে পারবে না। বিশ্ব ব্যাপী মানুষের এই মনোজগতে যে পরিমাণ আঘাত লেগেছে তা সহজে সেরে উঠবে না।

স্মরণাতীত কাল তো বটেই কত শত বছর আগে পৃথিবীর এক সাথে এই ক্ষতি হয়েছে তা গবেষণা করে দেখতে হবে। এই ক্ষতি গোটা পৃথিবীকে আরো কতদিন বহন করতে হবে তা হয়তো সময়ই বলে দিবে। কিন্তু এই ক্ষতির প্রভাব যে অনাগত ভবিষ্যত প্রজন্মসহ তরুণ প্রজন্মকে অনেক অনেক দিন বইতে হবে তাতে কোন সন্দেহ নাই। মানুষের মৃত্যুর চাইতেও কম অপূরণীয় ক্ষতি একে বলা যাবে না। এই ক্ষতি পৃথিবীকে ও পৃথিবীর মানুষকে কাটিয়ে উঠতে অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: সম্পাদক,সংসদগ্যালারী টোয়েন্টিফোরডটকম

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





Leave a Comment

You must be logged in to post a comment.

© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top