শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং, ৪ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩ সফর ১৪৪২ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » আগামী পাঁচটি উপনির্বাচন সুষ্ঠু হোক

আগামী পাঁচটি উপনির্বাচন সুষ্ঠু হোক

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী:

দেশে জাতীয় সংসদের পাঁচটি আসন শূন্য হওয়ায় শাসনতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতার কারণে আগামী কিছুদিনের মাঝে উপনির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন উপনির্বাচন সম্পন্ন করার সব আয়োজন শেষ করেছে। দেশের সরকারি দল তো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেই, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সবাই যে যার মতো প্রস্তুতিও নিচ্ছে। কয়েকটি আসনে দলীয় প্রার্থীর নামও ঘোষণা করা হয়েছে।

পাঁচটি উপনির্বাচনে সরকারি দল হেরে গেলেও ক্ষমতাচ্যুত হবে না, আর বিএনপি বা জাতীয় পার্টি পাঁচটি আসন পেলেও ক্ষমতাসীন হবে না। সুতরাং উভয়পক্ষ এ নির্বাচনটাকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে দেওয়া উচিত। তাহলে উভয়পক্ষ কার প্রতি কী পরিমাণ জনসমর্থন রয়েছে, তা বুঝতে পারবে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটা কর্মপন্থা নিয়ে অগ্রসর হতে পারবে।

নির্বাচন নিয়ে, বিশেষ করে উপনির্বাচন নিয়ে এ দেশে অভিজ্ঞতা ভালো নয়। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে প্রশাসন তাদের সহায়তা করে, নির্বাচন কমিশন নির্বাক বসে থাকে। ১৯৫৬ সালে এক উপনির্বাচন হয়েছিল কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায়। প্রার্থী ছিলেন দু’জন। প্রফেসর মফিজুল ইসলাম অ্যাডভোকেট এবং আমির হোসেন। তখন কেন্দ্রে ও প্রদেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আর আতাউর রহমান খান পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী। উভয়ে অবাধ গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, কিন্তু সরকারি প্রার্থী আমির হোসেনকে জেতানোর জন্য তারা সেদিন সব অপকৌশলই অবলম্বন করেছিলেন। ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর চট্টগ্রামের রাউজান এবং রাঙ্গুনিয়া উপজেলা কেন্দ্র থেকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং উভয় কেন্দ্র থেকে নির্বাচিতও হয়েছিলেন। পরে সালাউদ্দিন রাউজান কেন্দ্র ছেড়ে দেন। ওই কেন্দ্রের উপনির্বাচনে তার ভাই গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ১২/১টার সময় নির্বাচন শেষ হয়ে যায়। গিয়াসউদ্দিন কাদের বিপুল ভোটে হেরে যান। অথচ গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী হেরে যাওয়ার প্রার্থী ছিলেন না।

তখন জিয়াউর রহমান দেশের প্রেসিডেন্ট, তিনি ন্যায়-নীতিকে পদদলিত করে তার প্রার্থীকে জিতিয়ে নেন। ১৯৯১ সালের খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী তখন মাগুরার উপনির্বাচন হয়। ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপি খুবই উলঙ্গভাবে হস্তক্ষেপ করে জিতে যায়। তখন চিফ ইলেকশন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি আবদুর রউফ। তিনি মাগুরায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি এখনও জীবিত আছেন। সভা সমিতিতে বক্তৃতা করে বেড়ান। অবাধ নির্বাচনের বয়ান দেন।

নির্বাচনের দিন বিএনপির ৪০/৪৫ জন এমপি মাগুরায় উপস্থিত ছিলেন তারা তাকে অনুরোধ করে নির্বাচনি কেন্দ্র থেকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী তার কাছে অনিয়মের প্রতিকার চাওয়ার পরও তিনি তার কোনও সমাধানের চেষ্টা না করে গোপনে কেন্দ্র ত্যাগ করে ঢাকায় চলে আসেন। মূলত মাগুরার উপনির্বাচনের নগ্ন হস্তক্ষেপ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনকে জোরদার করে।

বিএনপি আমলে আরেকটি ন্যক্কারজনক উপনির্বাচন ছিল তেজগাঁও আসনের উপনির্বাচন। ২০০১ সালের নির্বাচনে মেজর মান্নান বিএনপি থেকে আবার বিজয়ী হলেও পরে বি. চৌধুরী রাষ্ট্রপতির পদ ত্যাগ করে নতুন দল করলে মান্নানও তার সঙ্গে দল থেকে পদত্যাগের কারণে আসনটি শূন্য হয়। তাতে উপনির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির মোসাদ্দেক আলী ফালু। বিপুল কারচুপির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয় এই উপনির্বাচনে। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে সবার চোখের সামনে ঘটে তা।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৫০ বছর হচ্ছে। বেদনাদায়ক কথা হলো আমরা মেরুদণ্ড শক্ত এমন একজন চিফ ইলেকশন কমিশনার পাইনি, যিনি নির্বাচন পদ্ধতির সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা বিশৃঙ্খলাকে একটা নিরপেক্ষ নিয়ম শৃঙ্খলার মাঝে আনতে উদ্যোগ নিয়েছেন। তল্পিবাহক চরিত্রের লোককে কখনও কমিশনার করা উচিত নয়। তাহলে নির্বাচন কমিশন তার ভাবমূর্তিও হারিয়ে ফেলে। তার অধীনে কোনও নির্বাচন হলে তা বিতর্কিত হয়। জনপ্রিয়তার জোরে টিকে আসার সম্ভাবনা থাকলেও এমন কমিশনের জন্য নির্বাচন হয়ে যায় ক্রেডিবিলিটি শূন্য।

বর্তমান নির্বাচন কমিশন নাকি একটি খসড়া প্রস্তাব প্রণয়নের চেষ্টা করছেন। তার বহু আলোচনা সমালোচনা পত্র-পত্রিকায় দেখছি। মহাত্মা গান্ধী তার ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় একবার লিখেছিলেন, ‘প্রতিষ্ঠিত রীতি পদ্ধতি যত বিশাল হবে তার অপব্যবহারের সম্ভাবনা হবে তত বেশি। তার নিবারণ মানে গণতন্ত্রকে বাতিল করা নয়, অপব্যবহার যত সম্ভব কমিয়া আনা।’ যে কোনও সংস্কার উদ্যোগে মহাত্মা গান্ধীর এ উপদেশটা অনুসরণ করা উচিত।

যাহোক, লিখছিলাম আসন্ন ৫টি উপনির্বাচন নিয়ে। গত দুই সাধারণ নির্বাচনে আমরা দেখেছি নির্বাচনের সময় পরিবেশকে বিপন্ন করে নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়েছিল। তাতে গণতান্ত্রিক বিশ্ব বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে খারাপ ধারণা নিয়েছিল। ধীরে ধীরে সে ধারণা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। এবারের উপনির্বাচন পাঁচটাকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ব্যাপারে আশা করি যে নির্বাচন কমিশন তার সাধ্যমতো চেষ্টা করবে।

একটা বিষয় লক্ষ করা উচিত, আমরা যেভাবে সব ক্ষেত্রে অবনতির দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছি তাতে মনে হচ্ছে যে আগামী ১০ বছরের মাঝে ক্ষমতায় যে থাকুক দেশের শাসন কাজ চালানো অসম্ভব হয়ে যাবে। এ বিষয়টা অনুধাবন করে সচেতন পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য রাজনীতিবিদ-আমলা সবার প্রতি আমরা অনুরোধ জানাই। বাংলা ট্রিবিউন ।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





Leave a Comment

You must be logged in to post a comment.

© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top