শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০ ইং, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৩ রবিউস-সানি ১৪৪২ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম

শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম

মো. আসাদ উল্লাহ তুষার:

 

কিছু মানুষের জন্মই হয় দেশকে ও সমাজকে কিছু দেয়ার জন্য। তাঁরা সবসময় দেশ ও মানুষের কল্যানের কথা চিন্তা করেন। তেমনই একজন মহান মানুষ প্রফেসর মযহারুল ইসলাম। প্রফেসর মযহারুল ইসলামের নাম শুনলেই একবাক্যে যাকে ধরে নেয় সবাই তিনি হলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক, কবি, গবেষক, প্রবন্ধকার, কথা সাহিত্যিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালযের সাবেক উপাচার্য, বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাপরিচালক, বাংলাদেশে ফোকলোরের জনক প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম। কীর্তিমান এই মানুষটির আজ মৃত্যুবার্ষিকী । দেড় যুগ আগে পৃথিবীর সব মায়া ত্যাগ করে আমাদের ছেড়ে চলে যান । তিনি ছিলেন সমসাময়িক কালের শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প সংস্কৃতি, রাজনীতি , অর্থনীতির বাতিঘর। বহুমাত্রিক প্রতিভার আলো ছড়ানো এমন গুণী পণ্ডিত মানুষের আজ বড় প্রয়োজন। তাঁর চীর বিদায়েও তাঁর মত ব্যক্তিত্বকে প্রায় প্রতিক্ষণই আমরা অনুভব করি।

প্রফেসর মযহারুল ইসলামের জন্ম ১৯২৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার করতোয়া নদীর ধারে সবুজ ছায়া সুশীতল চরনবীপুর গ্রামে। পিতার নাম ডা. মোহাম্মদ আলী। মযহারুল ইসলাম মেট্রিক পাশ করেন স্থানীয় তালগাছী আবু ইসহাক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে, ১৯৪৫ সালে। কৃতিত্বের সঙ্গে আই এ পাশ করেন সিরাজগঞ্জ কলেজ থেকে , ১৯৪৭ সালে। এর পর রাজশাহী সরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে অনার্স নিয়ে বিএ ক্লাশে ভর্তি হন। ১৯৪৯ সালে অনার্স পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫০ সালে অনুষ্ঠিত বাংলা এম এ প্রিভিয়াস পরীক্ষায় এবং ১৯৫১ সালে অনুষ্ঠিত এম এ ফাইনাল পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। একই সঙ্গে তিনি গোল্ড মেডালিষ্ট এবং কালীনারায়ণ স্কলারের গৌরব অর্জন করেন।
১৯৫২ সালের প্রথম দিকে তিনি ঢাকা কলেজে বাংলা বিভাগে লেকচারার পদে যোগদান করেন। ১৯৫৩ সালে মেধার ভিত্তিতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগদানের সুযোগ লাভ করেন। ১৯৫৬ সালের গোড়ার দিকে মযহারুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে সিনিয়র লেকচারার পদে যোগদান করেন। ১৯৫৮সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে মযহারুল ইসলাম তাঁর দ্বিতীয় পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন আমেকিার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ডিগ্রি অর্জনের পর এক বছর তিনি আমেরিকার শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে অধ্যাপনা করেন। ১৯৬৪ সালে দেশে ফিরে এসে বাংলা বিভাগের প্রফেসর এবং বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।১৯৬৫ সালে প্রফেসর ইসলাম কলা অনুষদের ডীন নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর পদে আমন্ত্রিত হন। হার্ভার্ডের মেয়াদ শেষ হবার পর তিনি ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি এ্যাট বার্কলীতে কিছুদিন ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭১সাল পর্যন্ত প্রফেসর মযহারুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালযের বাংলা বিভাগের অধ্যাপনা এবং সভাপতির দায়িত্ব পালনের পাশপাশি দেশে বিদেশে অসংখ্য সেমিনার- সিম্পোজিয়ামে অংশ গ্রহণ করেন।দেশ স্বাধীনের পরে একটি শক্তিশালী বাংলা একাডেমী প্রতিস্থার লক্ষে ড. মযহারুল ইসলামকে বঙ্গবন্ধু বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দান করেন। পরে ১৯৭৪ সালের ১৯ আগস্ট তারিখে মযহারুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে যোগদান করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবার পরিজনকে নিষ্ঠুভাবে হত্যার পর মাত্র এক মাসের মাথায় ১৯ সেপ্টেম্বর তাঁকে উপাচার্যের পদ থেকে সরিয়ে দেন।

ছাত্র জীবনে ছাত্র হিসেবে ইর্ষনীয় ফলাফল এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের কাছে অত্যান্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক ছিলেন ড. ইসলাম। কবি,লেখক, গবেষক ও ফোকলোরবিদ হিসেবেও প্রফেসর মযহারুল ইসলাম অনন্য । ড. মযহারুল ইসলাম শিক্ষাবিদ বা শিক্ষক হিসেবে অন্য সাধারণ আর দশটি শিক্ষকের মত শুধু শিক্ষাবিদ বা লেখকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সংগ্রামী, সাহসী, দেশপ্রেমিক, দূরদর্শী একজন বিবেকবান মানুষ। ছাত্রজীবনের শেষের দিকে তিনি ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তারপর পাকিস্তানি শাসক গোস্টির অন্যায় অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি সম্মুখ সারি থেকে লড়েছেন । ১৯৬৬ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবী উত্থাপনের পর দেশে যে ব্যাপক গণ- আন্দোলন শুরু হয়, সে গণ-আন্দোলনের সঙ্গে মযহারুল ইসলাম একাত্ম হয়ে ওঠেন। ৬ দফা আন্দোলন ধীরে ধীরে স্বাধীনতা আন্দোলনে রুপান্তরিত হতে থাকে। । বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজপথে নেমে মযহারুল ইসলাম ৬ দফা এবং স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুর প্রাক্কালে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু যখন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন , আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতাদের সঙ্গে মযহারুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডীর ৩২ নম্বর বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন।মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর সুনির্দিষ্ট নির্দেশ নিয়ে তাঁরা রাত ১০টার দিকে ৩২ নম্বর বাসা থেকে বের হয়ে আসেন। ২৫ মার্চ মধ্য রাতে বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশে শুরু হয়ে যায় ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে ড. মযহারুল ইসলাম প্রত্যক্ষভাবে অংশ গ্রহণ করেন। একজন শিক্ষাবিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েও দেশ মাতৃকার টানে নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে এপ্রিল এবং মে মাসে দেশের অভ্যন্তরে থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সংগঠিত করার কাজে মযহারুল ইসলাম নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। পাবনা, সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকায় মূলত তিনি কাজ করেন। কিন্তু জুন মাসের মাঝামাঝিতে এলাকাগুলো যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রনে চলে যায়, দেশের অভ্যন্তরে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এর ফলে ১৯৭১ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিনি তাঁর গ্রামের বাড়ি শাহজাদপুরের চরনবিপুর থেকে পায়ে হেঁটে গোপনে ভারতের দিকে যাত্রা শুরু করেন। বহু কষ্টে তিনি পায়ে হেঁটে বাঘা লালপুর হয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি যখন বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে ভারতের জলংগী সীমান্তে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর পরনে ছিল একটি লুংগী, মাথায় একটি গামছা এবং গায়ে একটি গেঞ্জি। পায়ে কোন জুতা ছিল না। স্ত্রী এবং ছেলে মেয়েদেরকে বাংলাদেশে রেখেই তাঁকে ভারতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়। নিজের পরিবারের সুখ-শান্তির চেয়ে দেশের স্বাধীনতাকে তিনি বড় করে দেখেছিলেন। তাঁকে না পেয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় এজেন্টদের সহায়তায় তাঁর গ্রামের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। পরিবার পরিজনকে এত সব বিপদের মধ্যে রেখেও ড. মযহারুল ইসলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রতিদিন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সাহসী ও বলিষ্ঠ বক্তব্য উপস্থাপন করতেন। প্রফেসর মযহারুল ইসলাম একই সঙ্গে মুক্তি যুদ্ধ করেছেন কলম দিয়ে এবং অস্ত্র হাতে। ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত হবার পর কাল বিলম্ব না করে ১৯৭১ সালের ১৯ ডিসেম্বর ভারতীয় সামরিক বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে অন্যান্য জাতীয় নেতাদের সাথে কলকাতা থেকে সদ্য স্বাধীন দেশের রাজধানী ঢাকায় আসেন প্রফেসর মযহারুল ইসলাম।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিস্ট ও বিস্বস্থ সহযোগী হিসেবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের এক মাসের মধ্যে উপাচার্যের পদ থেকে সরিয়ে কারাগারে নিক্ষেপের মত জঘন্য কাজ করে তৎকালীন খুনি সরকার। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাজনীতিবিদের বাইরে যে দুজন স্বনামধন্য শিক্ষাবিদকে তখন গ্রেফতার করা হয় তন্মদ্ধ্যে একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম অন্যজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান উপাচার্য বোস প্রফেসর ড. আব্দুল মতিন চৌধুরী। তাঁদের দুজনেরই দোষ ছিল তাঁরা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিস্ট ও তাঁর আদর্শের অনুসারী । তাঁরা দুজনই নিরাপরাধ হিসেবে কারাগারে থেকে উচ্চ আদালতের আদেশে মুক্তি লাভ করেন। পরবর্তীতে বিদেশের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে সুনামের সাথে কাজ করেন ।

প্রফেসর মযহারুল ইসলাম দূরদর্শী ও জনদরদি মানুষ ছিলেন। তিনি অনেক দুর দেখতে পেতেন, চিন্তা ছিল সুদুর প্রসারী। মানুষের দুঃখদুর্দশা তাঁর কবি মনকে নাড়া দিত। সেই কারনেই কিনা একজন শিক্ষাবিদ হয়ে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের শুরুর দিকে আশির দশকে নিজের বাড়িতে ক্ষুদ্র পরিসরে পোশাক তৈরি শুরু করেছিলেন। তখনই তাঁর চিন্তা ছিল মানুষের জন্য কিছু করা, বিশেষ করে তাঁর জন্মভুমির মানুষের জন্য কিছু করা। সেই ছোট্ট পরিসরের পোশাক কারখানাটি তিনি একদিন অন্যতম দেশসেরা শিল্প প্রতিষ্ঠানে পরিনত করেছেন। বহু মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে, দেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখছে । এই পোশাক কারখানা যখন চালু করে তখন তাঁর নিজ এলাকা শাহজাদপুর উপজেলার বহু বেকার যুবক যুবতির চাকুরির সুযোগ করে দেন, যার কারণে তাঁরা আজ স্বাবলম্বি। তাঁর সমস্ত ধ্যান ধারনায়ই ছিল সাধারণ প্রান্তিক মানুষ। তিনি ছিলেন ভীষণ রকম রাজনীতি সচেতন, ছিলেন বঙ্গবন্ধু অন্তঃপ্রান, বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে ছিলেন আপোষহীন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি ছিল অসীম দরদ। বঙ্গবন্ধু কন্যার কথা ফেলতে পারতেন না, সেই কারনে সরাসরি রাজনিতিতেও জড়িয়ে ছিলেন। জীবনের শেষের একযুগ আওয়ামীলীগকে এগিয়ে নিতে অনেক কাজ করেছেন। দুইবার সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে দুঃখজনক ভাবে পরাজয় বরন করেছেন। শেষবার নিশ্চিত বিজয় দলের কিছু উচ্চকাংখি বেইমানদের কারনে জয় হাতছাড়া হয়েছে। ক্ষতিটা হয়েছে শাহজাদপুর তথা সিরাজগঞ্জবাসীর, বলতে গেলে আওয়ামীলীগের শেখ হাসিনার। বাংলাদেশের মানুষ এমন একজন প্রতিভাবান বিদগ্ধ, সজ্জন মানুষের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সেবা নিতে পারলো না। এ বিষয়ে হয়তো মনে কষ্ট নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। প্রফেসর মযহারুল ইসলামের মত মানুষ এমপি মন্ত্রী হলে হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিক্ষিত, সজ্জন ভদ্রলোকের রাজনীতিতে আগমন আরও বেশী ঘটত। স্থানীয় পর্যায়ে ঘুষ দুর্নীতি অনিয়ম অত্যাচারের কষাঘাত সইতে হত না।

একজন ক্ষুদ্র রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিজের পথচলাটা সেই নব্বই সালের একেবারে গোঁড়ার দিকে এমন একজন মহান ব্যাক্তিত্বের ছায়ায়ই শুরু হয়েছিল।প্রফেসর মযহারুল ইসলাম ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী একজন সজ্জন মনিষী । তাঁর হাতেগড়া অনেক বিদগ্ধ মানুষ তাঁর যোগ্য ছাত্র বা সহকর্মী হিসেবে এখনো আলো ছড়াচ্ছেন। আমরা শাজাদপুরের অনেক মানুষই অন্যান্য সব কিছুর সাথে তাঁর নিকট থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে পথচলা শুরু করেছি। তিনি যেমন আমাদের পূর্বসূরিদের শিক্ষাগুরু, অভিভাবক, পৃতিতুল্য শিক্ষক, এসব কিছুরই মিশেলে তিনি আমাদের রাজনীতিরও আদর্শ শিক্ষক। তাঁর দেখানো পথেই আমাদের হাটার চেষ্টা। অবশ্য তাঁর রাজনিতিকেই সুনিপুণ ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর দুই সুযোগ্য সন্তান বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য প্রফেসর মেরিনা জাহান কবিতা ও সাবেক সাংসদ চয়ন ইসলাম। প্রফেসর মযহারুল ইসলামের সন্তান হিসেবে দুজনই বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট আপনজন হিসেবেই আছেন। তাঁরাও সমস্থ লোভ লালসা পায়ে ঠেলে বঙ্গবন্ধু কন্যার দেয়া দায়িত্ব ও স্নেহ ভালবাসা বয়ে চলছেন। এখানেও মযহারুল ইসলামের ছায়ায় সম্পর্কটা আদর্শিক ও আত্মিক ।

এক কথায় একজন সফল পরিপূর্ণ মানুষ ছিলেন প্রফেসর মযহারুল ইসলাম।ব্যাক্তি জীবনে সব ক্ষেত্রেই ইর্ষনীয় পর্যায়ের শীর্ষ থেকে কাজ করে গেছেন। শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প, সংস্কৃতি রাজনীতি, অর্থনীতি, অর্থনীতি,‌ অধ্যাপনা তাঁর সহজাত কর্ম । আর্ট এন্ড ইন্ড্রাস্ট্রির সফল রুপকার মযহারুল ইসলাম। পরিবারের প্রধান হিসেবে ইর্ষনীয়ভাবে সফল। চার সন্তানই আজ তাঁর আদর্শে বলিয়ান, জ্যেষ্ঠ কন্যা প্রফেসর মেরিনা জাহান কবিতা তাঁরই পথে হাটা শিক্ষাবিদ সরকারি নামকরা কলেজের অধ্যক্ষ পদে থেকে অবসর নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আহবানে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সফলভাবে তাঁরই সাথে কাজ করছেন । আরেক কন্যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মর্যাদার সাথে অধ্যাপনা করছেন। তাঁর বড় ছেলে চয়ন ইসলাম তাঁরই হাতে রাজনীতি ও শিল্প কারখানার পরিচালনার প্রদেয় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাঁরই জীবদ্দশায় একবার এবং তাঁর প্রয়ানের পর আরেকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে দলের প্রয়োজনে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ছোট সন্তান তথ্যপ্রযুক্তিবিদ শোভন ইসলাম বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বাবার রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠানকে তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানে পরিনত করে মানুষের কল্যানে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রফেসর ইসলামের ভাইয়েরাও আলোকিত মানুষ প্রফেসর আব্দুল খালেক ভাইয়ের মতই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। আরেক ভাই সরকারি কলেজের অধ্যাপক, আরেক ভাই সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সচিব। এই সব যোগ্য গুণী মানুষদের যোগ্য অভিভাবক ছিলেন প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম। তিনি সত্যিকারেই ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা আলোকিত স্বাপ্নিক মানুষ । আমরা দেশবাসী তাঁর জন্য গর্বিত, আমরা উত্তরবঙ্গের মানুষ, সিরাজগঞ্জের মানুষ, শাহজাদপুরের মানুষ আমরা ধন্য।

তিনি তাঁর জন্মভুমির মানুষকে খুবই ভালো বাসতেন। বলা চলে একটু বেশিই ভালবাসতেন।সারা পৃথিবী ঘুরে দেখেছেন, কিন্তু শেষ ঠিকানায় বেছে নিয়েছেন জন্মভূমি শাহজাদপুরের মাটিকেই। যে মাটি ধারন করেছিলেন এমন একজন সন্তানকে যিনি জন্মভুমির ঋন শোধ করতে আজীবন কাজ করে গেছেন। জন্মভুমির মাটিও নিশ্চয় গর্বিত এমন সন্তানকে ধারন করে। তাঁর কর্মই তাঁকে মহৎ করেছে, দেশের মানুষের কাছে তিনি একজন সজ্জন ভালো মানুষ হিসেবে নিজের স্থান করে নিয়েছেন। মৃত্যু তাঁকে চোখের আড়াল করেছে কিন্তু মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় চীর অম্লান হয়ে আছেন অম্লান হয়ে থাকবেন।

দেশবরেণ্য এই মহান শিক্ষাবিদ, পন্ডিত, বুদ্ধিজীবী, গবেষক আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ফোকলোরবিদ, ভাষা সংগ্রামী, সংস্কৃতিকর্মী, মুক্তিযুদ্ধের বীর সংগঠক প্রফেসর ড.মযহারুল ইসলাম ২০০৩ সালের ১৫ নভেম্বর সকাল ৮-১১ মিনিটে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। ১৮ই নভেম্বর বাদ মাগরিব প্রফেসর মযহারুল ইসলামকে শাহজাদপুরের শক্তিপুরস্থ তাঁর ’নূরজাহান’ নামের নিজ বাসভবনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। বেঁচে থাকতে প্রফেসর মযহারুল ইসলাম মানুষকে হৃদয় দিয়ে ভালবেসেছিলেন, তিনিও মানুষের অকুণ্ঠ ভালবাসা পেয়েছেন। আজকের এইদিনে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরন করি। মহান আল্লাহ পাক তাঁকে তাঁর সব ভালো কর্মের বিনিময়ে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





Leave a Comment

You must be logged in to post a comment.

© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top