বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল ২০২১ ইং, ৯ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১১ রমযান ১৪৪২ হিজরী

You Are Here: Home » জিরো আওয়ার » আমার বন্ধু হোসেন তওফিক ইমাম

আমার বন্ধু হোসেন তওফিক ইমাম

আব্দুল গাফফার চৌধুরী:

আমার বন্ধু হোসেন তওফিক ইমাম আর নেই। গত ৩ মার্চ বুধবার তিনি চলে গেছেন। আমার মতো বার্ধক্যজনিত রোগে তিনি ভুগছিলেন। আমি এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছি। তিনি সেই মৃত্যুর কাছে হার মেনেছেন। সুদূর লন্ডনে বসে যখন তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়েছি, ধাক্কা খেয়েছি। কিন্তু খুব বড় ধাক্কা খাইনি। কারণ গত এক বছর করোনার গ্রাসে এত বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন হারিয়েছি যে মৃত্যুজনিত শোকও এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে গেছে।

সাধারণ্যে তিনি পরিচিত ছিলেন এইচ টি ইমাম নামে। এই নামে তিনি বাংলাদেশের সর্বত্রই পরিচিত ছিলেন। একজন দক্ষ সিভিল প্রশাসক, প্রাজ্ঞ রাজনীতিক এবং আধুনিকমনা বুদ্ধিজীবী ছিলেন। বহু গ্রন্থ লিখেছেন। তাঁকে নিয়ে নিন্দা ও সমালোচনা অনেক শুনেছি। ভেবেছি কাজের মানুষকেই নিন্দা শুনতে হয়। অকাজের মানুষকে নয়।

এ টি এম শামসুল হক, আসফউদ্দৌলা, খসরুজ্জামান চৌধুরী, এনাম আহমদ চৌধুরী, মোকাম্মেল হক এবং আরো কতজন। তাঁরা প্রত্যেকেই আমার ব্যক্তিগত বন্ধু। তাঁরা কেউ আছেন, কেউ নেই। ঘনিষ্ঠতমদের মধ্যে ছিলেন এইচ টি ইমাম। তিনিও চলে গেলেন। তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনকথা লিখতে বসিনি। আমার এই লেখা একজন অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত বন্ধুকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো।

পাকিস্তান আমলে ইমাম যখন মহকুমা প্রশাসক হিসেবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তখন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হলেও ততটা ঘনিষ্ঠ হইনি। খবরের কাগজে আমার লেখা তিনি পড়তেন, সেই সুবাদেই পরিচয়। শেষ জীবনে এসেও তিনি আমার লেখা পড়তেন। লন্ডনে টেলিফোন করে তাঁর মতামত জানাতেন। কখনো কখনো আমার লেখায় ব্যক্ত মতামত নিয়ে কথা-কাটাকাটি হতো। কিন্তু আমার পাঠকটিকে হারাইনি।

১৯৭১ সালের সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কথা। জুন মাস। দেশত্যাগ করে আগরতলায় পৌঁছে দেখি সেখানে এক গাদা তরুণ বাঙালি সিএসপি অফিসার আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এইচ টি ইমামও আছেন। কিন্তু অন্য তরুণ অফিসারদের চেয়ে তাঁর দাপটটা বেশি। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় প্রায় বন্ধুত্বে পৌঁছেছে। ত্রিপুরায় সরকারি অফিসাররাও তাঁকে সমীহ করে চলেন। তাঁর কাছ থেকে তাঁরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ নিতেন।

এইচ টি ইমাম লেখাপড়া করতেন। তাঁর মেধা ও প্রজ্ঞা ছিল অসাধারণ। আগরতলায় নিযুক্ত ভারতের আইসিএস অফিসারদের অনেকে বাংলাদেশের সমবয়সী সিএসপিদের পাত্তা দিতে চাইতেন না। কিন্তু অল্পদিনেই এইচ টি ইমাম, আকবর আলি, ফখরুজ্জামান চৌধুরী তাঁদের ভুল ভেঙে দিয়েছিলেন। এইচ টি ইমামকে তো তাঁরা রীতিমতো সমীহ করতেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ রাজনৈতিক উপদেষ্টা ডি পি ধর একবার আগরতলায় এলেন বাংলাদেশি শরণার্থীদের অবস্থা দেখার জন্য। ত্রিপুরা রাজ্যের অবস্থা তখন ভালো নয়। ত্রিপুরার তখনকার অধিবাসীর সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ, পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থী গেছে ২০ লাখ। কুমিল্লার শত শত রিকশাওয়ালা আগরতলায় ঢুকে ত্রিপুরার রিকশাওয়ালাদের প্রায় বেকার করে দিয়েছে। এই ত্রিপুরা রাজ্যে তখন নির্বাচন আসন্ন। কিন্তু ২০ লাখ বাংলাদেশি শরণার্থীর ভয়ে নির্বাচন করতে ভয় পাচ্ছে শাসক ও বিরোধী দল উভয়েই।

সমস্যাটি নিয়ে আগরতলায় ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর বাসায় বৈঠক বসে। ডি পি ধর সেই বৈঠকে ছিলেন। এইচ টি ইমামকেও সেই বৈঠকে ডেকে নেওয়া হয়। ডি পি ধর যে কদিন আগরতলায় ছিলেন, সব সময় এইচ টি ইমামকে ডেকে পাঠাতেন। তাঁকে ডি পি ধর একটি বই উপহার দিয়েছিলেন। তখন সেটি সদ্য বেরিয়েছে। বইটি জুলফিকার আলী ভুট্টোর ‘মিথ অব ইনডিপেনডেন্টস’।

এই বইটি এইচ টি ইমাম আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। তখন আমাদের সম্পর্ক তুই-তোকারিতে পৌঁছেছে। বইটি আমার পড়া শেষ হলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বইটি তোর কেমন লেগেছে?’ বললাম, ভুট্টোর রাজনৈতিক কনসেপশন অত্যন্ত মডার্ন। তিনি পুরনো ইমপেরিয়ালিজমের যুগ শেষ হয়ে যে গ্লোবাল ইমপেরিয়ালিজমের যুগ শুরু হয়েছে, তাতে ভারতকে শায়েস্তা করার জন্য চীনকে আমেরিকার বিরুদ্ধে খেলাতে চান।’ এইচ টি ইমাম আমাকে বললেন, ‘তুই একজন ভালো রাজনৈতিক কলামিস্ট হবি।’ আমি পাল্টা বললাম, ‘তুমি একদিন বাংলাদেশের ডি পি ধর হবে।’

পরদিন প্রাচীন বটতলায় গিয়ে দেখি, কাবুলিওয়ালারা হাজারে হাজারে পাকিস্তানের বাতিল নোট কিনছে। তবে দাম দিচ্ছে অর্ধেক। এই নোট পশ্চিম পাকিস্তানে বাতিল করা হয়নি। সুতরাং এই নোট সেখানে নিয়ে পুরো দাম তারা আদায় করবে। তা আদায় করবে করুক। আমি হাতে কড়কড়ে আড়াই হাজার টাকার ভারতীয় নোট পেয়ে আপাতত সংকট মুক্তির স্বস্তি পেয়েছি।

আগরতলা থেকে আমি গৌহাটি (বর্তমানে গুয়াহাটি) হয়ে কলকাতা চলে যাই এবং মুজিবনগর সরকারের সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’র নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করি। পরবর্তী ৯ মাস এইচ টি ইমামের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। দুজনেই কলকাতায় থাকি। কিন্তু দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। তাঁর সঙ্গে আবার যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হয় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা দুজনেই যখন ঢাকায়। প্রবাসী সরকারের মতো ঢাকায় স্বাধীনতার পর তিনি কেবিনেট সেক্রেটারি ছিলেন। একটি সদ্যঃস্বাধীন দেশ পরিচালনার নানা নিয়ম তিনি তৈরি করেছেন। সরকারের বহু উচ্চ পদে ছিলেন। সে আলোচনায় আমি যাব না। এখানে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার একটি প্রমাণ আমি উল্লেখ করব।

২০০১ সালের সেই ক্রুশিয়াল সময়ের কথা লিখছি। বাংলাদেশে নির্বাচনের ধুমধাড়াক্কা চলছে। হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে দেশের একটি সিভিল সোসাইটি এবং স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলো। বেশির ভাগ পশ্চিমা দূতাবাস তাদের সাহায্য জোগাচ্ছে। তবু আমাদের আশা, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হবে।

এ সময় একদিন খুব সকালে আমার লন্ডনের বাসায় টেলিফোন বেজে উঠল। রিসিভার তুলতেই শুনলাম, ‘গাফ্ফার, আমি এইচ টি ইমাম। তুই আমার সঙ্গে পিকাডেলিতে একটি হোটেলে এখনই দেখা করতে পারবি? আমি আজই আমেরিকা চলে যাচ্ছি।’ বললাম, ‘সামনে নির্বাচন। তুমি আওয়ামী লীগের নির্বাচন ম্যানেজমেন্টের একজন কর্তা। তুমি এই সময় আমেরিকায় চলে যাচ্ছ, ব্যাপার কী?’

এইচ টি ইমাম বললেন, ‘তুই আমার হোটেলে আয়। কথা আছে।’ সেই সাতসকালে ট্যাক্সি নিয়ে তাঁর হোটেলে উপস্থিত হলাম। দেখলাম, এইচ টি ইমাম খুব বিষণ্ন মুখে বসে আছে। আমাকে দেখে ব্রেকফাস্টের অর্ডার দিলেন। বললাম, ‘এই সময় দেশ ছেড়ে পালাচ্ছ কেন?’ ইমাম বললেন, ‘এইবার আওয়ামী লীগ গো-হারা হারবে। তা দেশে বসে চোখের সামনে দেখতে পারব না।’ বললাম, ‘সে কি, আওয়ামী লীগের অবস্থা কি এতই খারাপ?’ ইমাম বললেন, ‘আওয়ামী লীগের অবস্থা খারাপ নয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র বড় গভীর। দেশি এবং বিদেশি ষড়যন্ত্র। কিন্তু এই ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের প্রস্তুতি নেই বললেই চলে।’

বলেছি, ‘তুমি কী করছ! তুমি তো আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছ এবং শেখ হাসিনার খুব কাছাকাছি।’ এইচ টি ইমাম মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘আমি মোটেই শেখ হাসিনার কাছাকাছি নই। কাছাকাছি হতে দেওয়া হচ্ছে না। এখন যাঁরা আওয়ামী লীগের নির্বাচন ম্যানেজমেন্ট করছেন, তাঁরা আমার কথা শোনা তো দূরের কথা, আমাকে অফিসে ঢুকতেও দেন না। তোমাকে সম্ভবত শেখ হাসিনা নির্বাচনী প্রচারণা শেষে জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দেবেন, তা লিখতে দেওয়া হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার ভাষণ লিখছেন শফিক রেহমান।’

এইচ টি ইমাম আমাকে জানালেন, ‘তোমার লেখা সেই ভাষণের অবস্থা কি জানো? সেটা ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ঢুকেছে। নতুন ভাষণ নতুন কর্মকর্তারা লিখেছেন। তা অত্যন্ত নিম্নমানের ভাষণ। এবার অবস্থা কী দাঁড়াবে আল্লাহই জানেন।’ বললাম, ‘আমার লেখা ভাষণ নিয়ে মাথা ঘামাই না। এটা শেখ হাসিনার ভাষণ। তিনি তাঁর পছন্দের ভাষণ পাঠ করবেন। তবে তোমার এমন অভিমান করে দেশ ছেড়ে পালানো ঠিক হচ্ছে না।’ এইচ টি ইমাম বললেন, ‘আমার করার কিছু নেই। দেশে বসে নির্বাচনী প্রচারণায় আনাড়ি ব্যবস্থাপনা আর আওয়ামী লীগের গো-হারা পরাজয় দেখব, তা আমার সহ্য হবে না।’

আর কথা হলো না। এইচ টি ইমাম চলে গেলেন আমেরিকায়। আমি চলে এলাম বাসায়। তারপর বেশ কয়েক দিন পরেই শুনলাম সেই হৃদয়বিদারক সংবাদ—আওয়ামী লীগ শোচনীয়ভাবে নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে। যা হোক, এরপর বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত গড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে পুনর্গঠিত হয়েছে। এইচ টি ইমাম দেশে ফিরে এসেছেন। গত তিনটি নির্বাচনেই তিনি আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির শীর্ষ নেতা ছিলেন। এই তিনটি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছে। শেখ হাসিনা এই তিনটি নির্বাচনেই সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ উপদেষ্টা পেয়েছিলেন তাঁর পাশে।

২০০৯ সালে নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে কেবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদায় জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। ২০১৪ সাল থেকে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। আমি লন্ডনে থাকলেও তাঁর সঙ্গে মাঝে মাঝে টেলিফোনে কথাবার্তা হতো। একবার তাঁকে বলেছিলাম, ‘তোমার তো ইচ্ছা ছিল তুমি বাংলাদেশের ডি পি ধর হও। তাইতো হয়েছ।’ এইচ টি ইমাম হেসে বলেছেন, ডি পি ধরের পরিণতি কি হয়েছিল জানো?

ডি পি ধর হৃদরোগে আকস্মিকভাবে মারা গিয়েছিলেন। তাতে ইন্দিরা গান্ধী একজন অভিজ্ঞ উপদেষ্টা হারিয়েছিলেন। এইচ টি ইমামেরও অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে শেখ হাসিনা তাঁর দুর্দিনের সহচর একজন অভিজ্ঞ উপদেষ্টাকে হারিয়েছেন। তাঁর স্থান কে পূর্ণ করবেন, তা আমি জানি না।

বন্ধু হিসেবে হোসেন তওফিক ইমামের কাছে আমার অনেক ঋণ। আমি যখন বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, বিবি রাসেল, গোলাম রব্বানী, মালা সরকার, আসাদুজ্জামান নূর প্রমুখ বন্ধুর সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনী নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি করি, তখন তওফিক ইমাম আমাকে ১৫ লাখ টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। নইলে ছবিটি শেষ করতে পারতাম না। তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হলো না, এটাই দুঃখ রয়ে গেল।

লন্ডন, মঙ্গলবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১

লেখকঃ সাংবাদিক, কলামিস্ট

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top