রবিবার, ৯ মে ২০২১ ইং, ২৬ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৭ রমযান ১৪৪২ হিজরী

You Are Here: Home » এক্সক্লুসিভ » জিয়ামুদুর রহমান ঘেন্না!

জিয়ামুদুর রহমান ঘেন্না!

বিশেষ প্ৰতিনিধি:

 

আসল রুপ বেরিয়ে এসেছে মাহমুদুর রহমান মান্নার। দেশব্যাপী রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস ও নাশকতার দায়ে সাম্প্রদায়িক হেফাজতে ইসলামের গ্রেফতার কৃত নেতাদের মুক্তির দাবি জানিয়ে স্বরূপে আবির্ভুত হলেন সাতবার দল গড়া ও বদল করা মাহমুদুর রহমান মান্না। তার আগে দেখে নেই এই মান্নার রাজনৈতিক চরিত্র। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল বদলের কথা উঠলে যাদের নাম সর্বাগ্রে আলোচনায় আসে সদ্য প্রয়াত মওদুদ আহমেদ,মরহুম কাজী জাফর ও মিরপুরের এসএ খালেকদের নাম উঠে আসে। কারণ তারা বেশিরভাগ সময়ই সরকারি দলে যোগ দিয়ে দলবদল করেছেন। আরো অনেকেই যে অনেকবার দল বদল করেছেন বা গড়েছেন তাদের সংখ্যাও কিন্তু কম না। তাদেরই একজন হলেন সাবেক ডাকসু ভিপি বর্তমানে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ।যিনি বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত-সমালোচিত ও বিতর্কিত রাজনীতিবিদ। যিনি এ পর্যন্ত সাতটি রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে নিজের নাম লিখিয়েছেন ।

স্বাধীনতার পরে ছাত্র রাজনীতিতে খুব নাম ডাক ছিল ।ছাত্রজীবনে ছিলেন তুমুল জনপ্রিয় ছাত্রনেতা। দুইটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ চাকসুর জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় পরিণত বয়স হওয়া সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি মান্না। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর দুইবার নির্বাচিত ভিপি। দেশ স্বাধীনের পরে ছাত্ররাজনীতির যখন তুমুল জোয়ার তখন চোখে পরেন তৎকালীন জাসদের কেন্দ্রীয় নেতাদের।সেই সময় মূল ধারার ছাত্রলীগ ত্যাগ করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারার ছাত্রলীগের সাথে যোগ দিয়ে ছাত্র রাজনীতিতে নিজের অনন্য অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তার প্রথম ছাত্র সংগঠন মূল ধারার অখন্ড ছাত্রলীগ যেটা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নামে পরিচিত সেই সংগঠন থেকে প্রথমে চাকসুর জিএস নির্বাচিত হন ।অবশ্য কথিত আছে ছাত্রত্বের শুরুতে ছাত্ৰ সংঘের সদস্য ছিলেন মান্না।পরবর্তীতে সেই সময়ের তুমুল জনপ্রিয় এবং তৎকালীন সরকার বিরোধী ছাত্র সংগঠন জাসদ ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত হয়ে ওই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক –
ও সভাপতি নির্বাচিত হন । তারপর জাসদ ধারার ছাত্রলীগ থেকে প্রথমবার ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হন, পরের বার তৃতীয়বারের মতো ছাত্র সংগঠন বদল করে বাসদ ধারার ছাত্রলীগে যোগদান করে দ্বিতীয়বারের মতো ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হন।

ছাত্র জীবনেই তিনটি ছাত্র সংগঠন করেন মান্না। যা সমকালীন ছাত্র রাজনীতিতে বিরল ঘটনা। ছাত্র রাজনীতি শেষে আফম মাহবুবুল হকের নেতৃত্বে কিছুদিনের জন্য মুল রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বা বাসদে যোগদান করেন যা ছিল তার চতুর্থ দল। পরে বাসদে দ্বন্দ দেখা দিলে এক সময়ের জাসদ নেতা মীর্জা সুলতান রাজার নেতৃত্বে জনতা মুক্তি পার্টি নামে নতুন দল গঠন করেন এবং পঞ্চম দল হিসেবে বেশ কয়েক বছর এই দল করে এখানে থাকা অবস্থায়ই নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ষষ্ঠ বারের মত দল বদল করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং একসময়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নিযুক্ত হন । এক সময়ের চরম আওয়ামীলীগ বিদ্বেষী মান্না এই সংগঠনে রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বেশী দুই দশকের বেশি সময় অবস্থান করেন এবং দুইবার নৌকা মার্কা নিয়ে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পরাজিত হন। রাজনীতির অঙ্গনে নিজেকে সব সময় অতি জ্ঞানী ভাবা মান্না এক-এগারোর জরুরী সরকারের সময় দলনেত্রী ও দলের বিপক্ষে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে নবম সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত হন এবং পরবর্তীতে দলের সম্মেলনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে বাদ পড়েন। আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পরা রাজনীতিই যার ধ্যান-জ্ঞান সেই মান্না কিছুদিন না আওয়ামী লীগ না অন্য দল এই অবস্থা থেকে বলা ও লেখায় ব্যস্ত হয়ে আস্তে আস্তে বর্তমান সরকার ও আওয়ামীলীগ বিরোধী সমালোচনায় লিপ্ত হয়ে এই দল থেকে দূরে সরে যান ।

তাকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়নি বা তিনি আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগও করেননি। এই অবস্থা কিছুদিন চলার পর নিজের সরকারবিরোধী অবস্থান জোরালো করেন। বর্তমান সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাথে হাত মিলিয়ে চলমান রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত হয়ে সপ্তম বারের মতো রাজনৈতিক দল হিসেবে নাগরিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেই এ দলের প্রধানের দায়িত্ব নেন। যদিও নাগরিক ঐক্য এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এই দল নিয়ে নানা তৎপরতার এক পর্যায়ে প্রায় বছর দুয়েকের মত কারান্তরীণও থাকেন।

মান্নার রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হয়তো রাজনৈতিক অঙ্গনে কখনো তেমন কারো চোখে পড়েনি বা আলোচনায়ও আসেনি। কারণ মান্না কোন সরকারি রাজনৈতিক দলে কোন দিন যোগ দেননি। আবার অতি অস্থিরতা ও বেশি পরিপক্কতার কারণে কোন রাজনৈতিক দলে বেশিদিন টিকেও থাকতে পারেননি।তাই তিনি হয় নতুন দল গঠন করেছেন না হয় নতুন কোনো দলে যোগদান করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় ছাত্রজীবনে যে রাজনৈতিক দলের চরম বিরোধিতা করেছিলেন সেই আওয়ামী লীগেই তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় প্রায় দুই দশক পার করে এই দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বড় নেতা হয়েছিলেন।

বর্তমানে নাগরিক ঐক্যের প্রধান হয়ে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি’র নেতৃত্বে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র নির্বাচনী প্রতিক ধানের শীষ নিয়ে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের প্রাথী হিসেবে নিজ জন্মস্থান বগুড়া থেকে নির্বাচন করে পরাজিত হন। ছাত্র জীবনে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তিনবার শীর্ষ পদে জয়ী হলেও জাতীয় নির্বাচনে নৌকা ও ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করে জনসম্পৃক্ততা না থাকার কারণে একাধিকবার পরাজয় বরণ করেন। আবার ছাত্ৰজীবনে জনপ্রিয় ছাত্রনেতা থাকা সত্বেও তৎকালীন অবৈধ সামরিক শাসক জিয়ার বিরুদ্ধে তেমন কোন আন্দোলনও করেননি। বরং জিয়ার কাছ থেকে কিছু সুবিধা নিয়ে বেশ অর্থকড়ি করেছিলেন। তখন এই নিয়ে অনেক মুখরোচক অনেক কথাই শোন যাচ্ছিল। যে মামলায় কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হয়েছিল সেই মামলায় মান্না বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত-সমালোচিত ও বিতর্কিত, বলা এবং লেখায় পারদর্শী বাকপটু মান্না ছাত্র রাজনীতির সেই অতীত ক্যারিয়ারের উপর ভর করে টিভি টকশোতে ভালো বলতে পারা এই নেতা ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার কল্যাণে এখনো রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় আছেন। ভবিষ্যতে কোন রাজনৈতিক দলে থিতু হন সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক করা ও করতে চাওয়া মাহমুদুর রহমান মান্না সেটাই এখন দেশবাসীর দেখার বিষয়। গুঞ্জন আছে এই মহামারীর মধ্যেও খালেদার নিয়মিত খোঁজ নেয়ায় ও হেফাজতে ইসলামের নেতাদের মুক্তি দাবি করায় অষ্টম দল হিসেবে বিএনপির পানি গ্রহণ করতে পারেন মান্না। নানা সময়ে রাজনৈতিক বিতর্কিত ভূমিকা রাখা ও আদর্শহীন হয়ে পড়ায় ও সামরিক শাসক জিয়ার কাছ থেকে উপঢৌকন নেয়ার জন্যই কিনা তার একসময়ের সহযোদ্ধা কবি মোহন রায়হান আশির দশকে মান্নার নাম দিয়েছিলেন জিয়ামুদুর রহমান ঘেন্না!

Tweet about this on TwitterShare on Google+Print this pageShare on LinkedInShare on Tumblr





© 2014 Powered By Sangshadgallery24.com

Scroll to top